নতুন সরকার কি পারবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ যে সংকটের সঙ্গে বারংবার লড়াই করছে, তার মধ্যে ডেঙ্গু অন্যতম প্রধান এবং প্রাণঘাতী। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম আসার আগেই জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে- হাসপাতালের করিডোর কি আবার পূর্ণ হয়ে যাবে লাশে? নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে: নতুন সরকার কি পারবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে? এটি শুধু প্রশাসনিক সফলতার প্রশ্ন নয়, বরং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর কোনো ঋতুভিত্তিক রোগ নয়, বরং বছরব্যাপী এক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি ডেঙ্গু আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরেও এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে মহামারি আকারে। পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে মশক নিধনের নামে নিম্নমানের ওষুধ প্রয়োগ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দুর্নীতির অভিযোগ ছিল নিয়মিত ঘটনা।
নতুন সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই জরাজীর্ণ ব্যবস্থাটাকে আমূল বদলে ফেলা। মানুষের প্রত্যাশা অনেক, কিন্তু সময় খুব কম। কারণ এডিস মশা রাজনীতির পটপরিবর্তনের অপেক্ষায় বসে থাকে না; সে তার বংশবৃদ্ধি চালিয়ে যায় প্রকৃতির নিয়মেই। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নতুন সরকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। মশা নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের গুণগত মান যাচাইয়ে কঠোরতা অবলম্বন করা হচ্ছে। দুর্নীতির মাধ্যমে অকার্যকর ওষুধ ক্রয়ের পথ বন্ধ করা হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নিবেদিত বিছানা বাড়ানো এবং এনএস১ (NS1) অ্যান্টিজেন টেস্ট কিটের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু সদিচ্ছা দিয়ে এই দৈত্যকে বোতলবন্দি করা সম্ভব নয়। নতুন সরকারের সামনে বেশ কিছু কাঠামোগত বাধা রয়েছে।
বাংলাদেশের শহরগুলোতে বিশেষ করে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত নাজুক। যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য এবং জমা জল এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান দ্রুত করা কঠিন। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্রতা মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের স্থানীয় প্রচেষ্টাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে কাজের সুসমন্বয় না হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। এক পক্ষ মশা মারলে আর অন্য পক্ষ নর্দমা পরিষ্কার না করলে ফল শূন্যই থাকে। নতুন সরকারকে যদি সত্যিই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়, তবে প্রথাগত ‘ফগিং’ বা মশা মারার ধোঁয়ার বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি, তা ম্যাপ করে সেই হটস্পটগুলোতে বিশেষ অভিযান চালাতে হবে। এন্টোমোলজিস্ট বা কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশক নিধন করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কেবল জুলাই-আগস্টের কাজ নয়। জানুয়ারি থেকেই লার্ভা নিধনের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করতে হবে। সরকার একাই সব করতে পারবে না। প্রতিটি নাগরিককে তাদের বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সচেতন করতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে।
নতুন সরকার পারবে কি পারবে না, তার উত্তর নির্ভর করছে তাদের কৌশলী পরিকল্পনা এবং মাঠপর্যায়ে সেটির কঠোর বাস্তবায়নের ওপর। শুধু সভা-সেমিনার বা লোক দেখানো মশক নিধন অভিযান দিয়ে ডেঙ্গু হারানো সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়া মানে শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং হাজারো মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। নতুন সরকার যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে গুরুত্ব দেয় এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে, তবে অবশ্যই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তবে সময় ফুরিয়ে আসছে, কথা বলার চেয়ে এখন কাজ করে দেখানোর সময়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
