পশ্চিম তীরে সহিংসতার বিস্তার

সংঘাতের রাজনীতি, মানবাধিকার ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা

সাদিয়া সুলতানা রিমি

প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অধিকৃত পশ্চিম তীর আবারও বিশ্ববিবেককে নাড়া দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান দখলদারিত্ব, নিরাপত্তা অভিযান, বসতি সম্প্রসারণ এবং পাল্টা প্রতিরোধ সব মিলিয়ে এই ভূখণ্ডটি যেন এক অবিরাম অস্থিরতার প্রতীক। সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতার মাত্রা যে হারে বেড়েছে, তা শুধু একটি সামরিক বা নিরাপত্তা সংকট নয়; বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। গাজার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, এবং এই সমান্তরাল উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

হেবরন ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক অভিযানের খবর নতুন নয়, কিন্তু এর পুনরাবৃত্তি একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে আনে সংঘাতটি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি কাঠামোগত বাস্তবতা। হেবরন অঞ্চলে অভিযান, বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, সম্পত্তি ধ্বংস ও গ্রেপ্তার এসব ঘটনা মিলিয়ে একটি স্থায়ী ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো এই সহিংসতার চাপে ক্রমাগত ভেঙে পড়ছে।

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো সহিংসতার বহুমাত্রিক চরিত্র। একদিকে সামরিক অভিযান, অন্যদিকে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা দুইয়ের মধ্যে সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, নিরাপত্তার যুক্তি সামনে থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এর ফল হচ্ছে সাধারণ মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও সামাজিক অবক্ষয়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে বসতি সম্প্রসারণের চাপ এবং নিরাপত্তা অভিযানের কারণে মানুষ তাদের জমি ও বাড়ি হারানোর ভয় নিয়ে বেঁচে আছে।

এই পরিস্থিতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই, কারণ একই সময়ে গাজায় চলমান যুদ্ধ অঞ্চলটির সামগ্রিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। গাজা কেন্দ্রিক সংঘাত শুধু একটি ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর রাজনৈতিক ও মানসিক প্রভাব পশ্চিম তীরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলস্বরূপ নিরাপত্তা অভিযান বৃদ্ধি, নজরদারি জোরদার এবং সংঘর্ষের আশঙ্কা বেড়েছে। সংঘাতের এই ‘ডমিনো প্রভাব’ প্রমাণ করে যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বকে খণ্ডিতভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক মহলও বিষয়টি নিয়ে ক্রমশ উদ্বেগ প্রকাশ করছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে যে সতর্কবার্তা দিয়েছে, তা পরিস্থিতির গভীরতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নীতিগত কিছু পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যাগত অবস্থান পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি করছে। যদিও এই অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক সংস্থার এমন পর্যবেক্ষণ সংঘাতের মানবাধিকার দিকটিকে সামনে নিয়ে আসে।

সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াফা ও আল জাজিরা-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যম ঘটনাগুলো তুলে ধরছে, যা বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে ভূমিকা রাখছে। তবে তথ্যের ভিন্নতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে অনেক সময় ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যায় পার্থক্য দেখা যায়। এই তথ্যযুদ্ধও বাস্তব সংঘাতের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সহিংসতার আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে জনসংখ্যার ওপর। ক্রমবর্ধমান বাস্তুচ্যুতি শুধু মানবিক সংকটই তৈরি করছে না, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বাস্তবতাও তৈরি করছে। যখন পরিবারগুলো নিরাপত্তার অভাবে এলাকা ছেড়ে যায়, তখন তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা কমে যায়। এতে করে ভূখণ্ডের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতের যেকোনো শান্তি আলোচনাকে আরও জটিল করে তোলে।

পশ্চিম তীরের অন্যান্য এলাকাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। রামাল্লাহ ও জেনিন অঞ্চলে অভিযান, তল্লাশি ও অবকাঠামো ধ্বংসের খবর প্রমাণ করে যে সহিংসতা কোনো একক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। তবে এর ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বোধ ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে এই সহিংসতার শেষ কোথায়? সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো পক্ষই সম্পূর্ণ নিরাপত্তা অর্জন করতে পারছে না, আবার রাজনৈতিক সমাধানের পথও কার্যত স্থবির। শান্তি প্রক্রিয়া বহু বছর ধরেই অচল, এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এতটাই গভীর যে নতুন উদ্যোগ নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সংঘাত যেন এক ধরনের ‘স্থিতিশীল অস্থিরতা’তে রূপ নিয়েছে, যেখানে সহিংসতা কমে-বাড়ে কিন্তু শেষ হয় না।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল। একটি প্রজন্ম এমন এক বাস্তবতায় বড় হচ্ছে যেখানে সহিংসতা, চেকপয়েন্ট, অভিযান ও অনিশ্চয়তা তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে ক্ষোভ, হতাশা ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতের শান্তির সম্ভাবনাকে আরও ক্ষীণ করে দেয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিও এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বৃহৎ শক্তিগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান, আঞ্চলিক জোট, নিরাপত্তা স্বার্থ সব মিলিয়ে এই সংঘাত শুধু স্থানীয় নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির অংশ। ফলে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন অনেক সময় ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আড়ালে পড়ে যায়।

এই দ্বৈততা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেও সামনে আনে। তবে সংকটের মধ্যেও একটি সত্য স্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সমাধান, পারস্পরিক স্বীকৃতি ও আস্থার পরিবেশ তৈরি ছাড়া স্থায়ী শান্তি অসম্ভব। ইতিহাস দেখিয়েছে, যখনই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়েছে, তখন সহিংসতা কিছুটা হলেও কমেছে; আর যখন তা ভেঙে পড়েছে, তখন সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা পুনর্গঠন। স্থানীয় পর্যায়ে সহাবস্থান, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও মানবিক উদ্যোগ এসব ছোট পদক্ষেপও বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন, যাতে সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের পথ আবারও সক্রিয় হয়।

সবশেষে বলা যায়, পশ্চিম তীরের সহিংসতা শুধু একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট নয়; এটি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের পরীক্ষাও। যতদিন না রাজনৈতিক সমাধানের বাস্তব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, ততদিন এই অস্থিরতা নতুন নতুন রূপে ফিরে আসবে। শান্তির পথ কঠিন, দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত তবু বিকল্প নেই। কারণ সহিংসতার এই চক্র ভাঙতে না পারলে ক্ষত শুধু ভূখণ্ডে নয়, মানুষের ভবিষ্যতেও গভীর হয়ে উঠবে।

সাদিয়া সুলতানা রিমি

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়