আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়, বরং সম্ভাবনার অপমৃত্যু

আমানুর রহমান

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জীবনের কোনো এক চরম ক্রান্তিলগ্নে চারপাশের সবকিছু যখন ভীষণ অন্ধকার আর দমবন্ধ করা মনে হয়, তখন অনেকেই হয়তো ভেবে বসেন, ‘এটাই শেষ, আর পারছি না।’ কষ্ট, হতাশা, গ্লানি বা ব্যর্থতার ভার যখন পাহাড়সম হয়ে বুকের ওপর চেপে বসে, তখন মৃত্যুকেই একমাত্র মুক্তির পথ বলে ভ্রম হতে পারে। কিন্তু আবেগ সরিয়ে রেখে নিরেট যুক্তি আর বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে উত্তরটা অত্যন্ত স্পষ্ট- আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়।

বরং এটি হলো সব সমাধানের সম্ভাবনার চিরস্থায়ী সমাপ্তি। এটি এমন একটি দরজা, যা একবার বন্ধ করলে আর খোলার কোনো উপায় থাকে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য মতে, পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় সাত লাখ মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এটি শুধু একটি গাণিতিক সংখ্যা নয়; এটি আমাদের চারপাশের গভীর ও নীরব মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের করুণ প্রতিচ্ছবি।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আত্মহত্যার চিন্তার পেছনে মূলত কাজ করে মানুষের ‘টানেল ভিশন’ বা দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা। তীব্র মানসিক যন্ত্রণা বা বিষণ্ণতার সময় মানুষের মস্তিষ্ক অন্য কোনো বিকল্প বা আশার আলো দেখতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। সেই মুহূর্তে মনে হয়, এই কষ্ট চিরস্থায়ী এবং এর কোনো শেষ নেই। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। বিষণ্ণতা বা চরম উদ্বেগের মতো সংকটগুলো অন্যান্য শারীরিক রোগের মতোই স্বাভাবিক। এগুলো জাদুকরী কিছু নয়, বরং মস্তিষ্কের রাসায়নিক উপাদানের ভারসাম্যহীনতা এবং পারিপার্শ্বিক চাপের ফল, যা পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য। যে মানসিক যন্ত্রণাকে আজ অজেয় মনে হচ্ছে, সময়ের ব্যবধানে এবং সঠিক চিকিৎসায় সেটি একটি অতীত স্মৃতিতে পরিণত হতে বাধ্য।

অনেকেই মনে করেন, পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেই নিজের সব কষ্টের চূড়ান্ত অবসান ঘটবে। কিন্তু এটি একটি মস্ত বড় যৌক্তিক ভ্রান্তি। আত্মহত্যা আসলে কোনো কষ্টকে শেষ করে না; সেটি শুধু নিজের কাছ থেকে প্রিয়জনদের কাছে হস্তান্তরিত হয়। একজন মানুষের আত্মহননের পর তার পরিবার, সন্তান, বাবা-মা বা বন্ধুরা যে অবর্ণনীয় অপরাধবোধ, শূন্যতা ও আজীবন ট্রমার মধ্য দিয়ে যান, তা তাদের ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। অর্থাৎ, যে কষ্টের হাত থেকে বাঁচতে একজন মানুষ এই চরম পথ বেছে নেন, সেই একই যন্ত্রণার আগুন তিনি তার ভালোবাসার মানুষদের বুকে জ্বেলে দিয়ে যান। যুক্তির বিচারে, অন্যের কাঁধে নিজের কষ্টের পাহাড় চাপিয়ে দেওয়া কখনই সমস্যার সমাধান হতে পারে না।

ইতিহাস ও বাস্তব জীবনের অসংখ্য ঘটনা প্রমাণ করে যে, মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা অসীম। যারা অতীতে আত্মহত্যার চেষ্টা করে কোনো কারণে বেঁচে গেছেন, বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে যে তাদের এক বিশাল অংশই নিজেদের সেই সাময়িক সিদ্ধান্তের জন্য পরবর্তীতে গভীরভাবে অনুতপ্ত হয়েছেন। তারা বুঝতে পেরেছেন, তারা আসলে মরতে চাননি; তারা শুধু সেই মুহূর্তের কষ্টটা থেকে বাঁচতে চেয়েছিলেন।

এর মানে হলো, আত্মহত্যার তীব্র আকাঙ্ক্ষা একটি সাময়িক আবেগ বা ক্ষণস্থায়ী মানসিক অবস্থার ফসল মাত্র। একটি সাময়িক ও পরিবর্তনশীল সমস্যার জন্য নিজের জীবনের মতো অমূল্য সম্পদের চিরস্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া কখনই যুক্তিসংগত হতে পারে না। আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য বা বিষণ্ণতা নিয়ে কথা বলা এখনও অনেকটা ট্যাবু। অনেকেই ভাবেন, মন খারাপ থাকা মানেই দুর্বলতা। কিন্তু এই নীরবতার সংস্কৃতি আমাদের ভাঙতে হবে। ব্যর্থতা, হতাশা বা অপমান জীবনেরই একটি স্বাভাবিক অংশ। যখন একা এই মানসিক ভার বহন করা অসম্ভব মনে হবে, তখন কথা বলা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবার বা প্রয়োজনে পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া কোনোভাবেই দুর্বলতা নয়, বরং এটি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম ও সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ। আমাদের দেশেই এখন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটসহ ‘কান পেতে রই’-এর মতো বিভিন্ন হেল্পলাইন সেবা রয়েছে, যেখানে পরিচয় গোপন রেখেও মানসিক সহায়তা নেওয়া যায়। জীবন একটি প্রবহমান নদীর মতো। এতে জোয়ার-ভাটা থাকবে, ঝড়-তুফান আসবে- এটাই প্রকৃতির নিয়ম। টানা কয়েকদিন মেঘলা আকাশ মানেই যেমন সূর্যের মৃত্যু নয়, তেমনি জীবনের একটি-দুটি খারাপ অধ্যায় মানেই পুরো জীবনের সমাপ্তি নয়। আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান তো করেই না, বরং আগামীকাল যে অপার সম্ভাবনা বা নতুন সকালটি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিল, সেটিকে চিরতরে মুছে দেয়। যতদিন শ্বাস আছে, ততদিন যেকোনো ধ্বংসস্তূপ থেকেই আবার নতুন করে জীবন শুরু করা সম্ভব। তাই জীবনকে মাঝপথে থামিয়ে না দিয়ে, সমস্যার শেষ দেখার জন্য সাহসের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়াতেই জীবনের প্রকৃত অর্থ ও সমাধান লুকিয়ে আছে।

আমানুর রহমান

লেখক, কবি ও কলামিস্ট