ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও আগামীর বাংলাদেশ

এম মহাসিন মিয়া
মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও আগামীর বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, এটি একটি চলমান রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক সংগ্রামের ধারাবাহিক বিবর্তন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির অস্তিত্ব, মর্যাদা ও স্বাধিকারের চূড়ান্ত লড়াই, যার মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সেই যুদ্ধ শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার বহন করেছিল। সময়ের ব্যবধানে সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, আর কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে, এই প্রশ্নই বারবার নতুন আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ, যা আগামীর বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা ছিল বৈষম্যের অবসান, জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তানি শাসনামলে রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক শোষণ ও সাংস্কৃতিক দমননীতি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা তাই জনগণের কাছে ছিল অমূল্য আমানত। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধানের চার মূলনীতি, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চেতনারই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির অভাব সেই স্বপ্নকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ নানা সংকট অতিক্রম করেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, দলীয়করণ ও প্রশাসনিক দুর্বলতা গণতান্ত্রিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও বৈষম্য, বেকারত্ব ও সুশাসনের ঘাটতি নাগরিক অসন্তোষ বাড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় বিভিন্ন সময়ে ছাত্র আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন ও গণজাগরণ দেখা দিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই নাগরিক অসন্তোষের একটি বিস্তৃত ও সংগঠিত রূপ, যেখানে বিশেষভাবে তরুণ সমাজ নেতৃত্বে ছিল। এটি কোনো একক ইস্যুর আন্দোলন নয়, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার একটি সম্মিলিত প্রয়াস।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তি ছিল এর অংশগ্রহণমূলক চরিত্র। শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, পেশাজীবী ও সাধারণ নাগরিক, বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ এতে যুক্ত হয়েছিল। কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক বৈষম্য, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা এই আন্দোলনের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। এই অভ্যুত্থান দেখিয়েছে, রাষ্ট্র যদি নাগরিক আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে, তবে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদও একসময় বিস্ফোরিত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করেছে যে তরুণ প্রজন্ম শুধু সুবিধাভোগী নয়, বরং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে চায়।

মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে একটি মৌলিক সেতুবন্ধন রয়েছে, দুটিই জনগণের ক্ষমতায়নের কথা বলে। মুক্তিযুদ্ধ ছিল শোষণকারী রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম, আর জুলাই ছিল নিজ রাষ্ট্রের ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতার বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিবাদ। এই বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা একবার অর্জন করলেই তা চিরস্থায়ী হয় না, বরং প্রতিনিয়ত তা রক্ষা ও পুনর্গঠন করতে হয়। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সমান সুযোগের নিশ্চয়তা।

আগামীর বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রথমেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকারকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও কার্যকর করতে না পারলে গণতন্ত্র টেকসই হবে না। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রকে ব্যক্তিনির্ভরতা থেকে মুক্ত করে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমান প্রবেশাধিকার ছাড়া উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় না। বৈষম্য কমানো মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই বাস্তব প্রয়োগ।

তৃতীয়ত, রাজনীতিতে সহনশীলতা ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। ভিন্নমতকে দমন নয়, বরং গ্রহণ করার মানসিকতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, তরুণ ও নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং নৈতিক নেতৃত্ব বিকাশ সময়ের দাবি। চতুর্থত, শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিহাস ও নাগরিকত্ববোধের সমন্বয় ঘটাতে হবে, যাতে মুক্তিযুদ্ধ শুধু পাঠ্য নয়, নৈতিক প্রেরণায় পরিণত হয়।

সব মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ আমাদের আত্মত্যাগ ও স্বপ্ন দেখার সাহস শিখিয়েছে, আর জুলাই গণঅভ্যুত্থান শিখিয়েছে প্রশ্ন করার ও দায়িত্ব নেওয়ার শক্তি। এই দুইয়ের সমন্বয়েই আগামীর বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে, যেখানে রাষ্ট্র হবে নাগরিক বান্ধব, আর নাগরিক হবে সচেতন ও দায়িত্বশীল। ইতিহাস আমাদের সামনে সুযোগ এনে দিয়েছে ভুল সংশোধনের, প্রতিষ্ঠান সংস্কারের এবং গণতন্ত্রকে গভীর করার। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।

এম মহাসিন মিয়া

সাংবাদিক ও লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত