তারুণ্যের দীপ্তিতে আলোকিত ভবিষ্যৎ
মিজানুর রহমান মিজান
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ তরুণ প্রাণের অফুরন্ত সম্ভাবনার দেশ। এ দেশের আকাশে এখনও ভেসে বেড়ায় অগণিত স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও প্রতিশ্রুতির রঙধনু। এই সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তরুণ প্রজন্ম- যাদের রক্তে আছে আগুনের উষ্ণতা, মনে আছে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, চোখে আছে এক উজ্জ্বল আগামীর প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয়, একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার মানবসম্পদ। আর সেই মানবসম্পদের সবচেয়ে কর্মক্ষম, উদ্যমী ও উদ্ভাবনশীল অংশ হলো তরুণ সমাজ। এই তরুণদের নেতৃত্বেই গড়ে উঠতে পারে নতুন বাংলাদেশ- সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও আত্মনির্ভর এক রাষ্ট্র।
‘তরুণদের নেতৃত্ব আগামীর বাংলাদেশ’- এই বাক্যটি শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি এক বিশ্বাস, এক দিকনির্দেশনা, এক প্রাণের আহ্বান। ইতিহাস সাক্ষী, পরিবর্তনের প্রতিটি অধ্যায়ে তরুণরাই ছিল অগ্রদূত। তারা আন্দোলনের মশাল হাতে ভবিষ্যৎ গড়ার পথ দেখিয়েছে, স্বাধীনতা এনেছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে, সমাজে নতুন চিন্তার সূচনা করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে তরুণদের পদচিহ্ন অম্লান। তাই আগামী বাংলাদেশও তাদের হাতেই নির্মিত হবে- এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশের জন্মগাথা মূলত তরুণদের সংগ্রাম, ত্যাগ ও আদর্শের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যারা মাতৃভাষার অধিকার আদায়ে প্রাণ দিয়েছিলেন, তারা ছিলেন তরুণ ছাত্র। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার- তাদের বয়স তখন বিশের কোঠায়, কিন্তু সাহস ছিল পাহাড়সম। তাদের রক্তে লেখা হয়েছিল বাংলা ভাষার অমর জয়গান।
এরপর আসে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান- তরুণ ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকের ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহ। তাদের হাত ধরেই পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল সমগ্র বাঙালি জাতি। সেই তারুণ্যের তেজ স্বাধীনতার আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তরুণদের অবদান অনস্বীকার্য। মুক্তিযোদ্ধাদের বড় অংশই ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া ছাত্র- যারা বই ছেড়ে হাতে নিয়েছিল অস্ত্র, জীবন বাজি রেখে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছিল।
স্বাধীনতার পরও তরুণ নেতৃত্বের দীপ্তি থেমে থাকেনি। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তরুণ ছাত্রসমাজ আবারও অগ্রভাগে থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে। এবং সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়- ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন, যেখানে তরুণরা আবারও প্রমাণ করেছে যে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তারা কখনও পিছপা হয় না। ন্যায্য দাবি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অধিকার, এবং রাষ্ট্রে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার দাবিতে লাখো তরুণের শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণ বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে- বাংলাদেশের পরিবর্তনের নিয়ামক শক্তি আজও তারুণ্য। বর্তমান বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশই তরুণ-১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। এটি এক বিশাল জনমিতিক সুবিধা, যা উবসড়মৎধঢ়যরপ উরারফবহফ নামে পরিচিত। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ এখন তার তরুণ জনগোষ্ঠী। তরুণরা আজ শুধু শ্রমজীবী নয়, বরং তারা উদ্ভাবনী শক্তির প্রতীক। আগামীর ‘আধুনিক বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নে তরুণদের অবদান অপরিসীম। আইটি খাতে স্টার্টআপ সংস্কৃতি, ই-কমার্স, অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, গেম ডেভেলপমেন্ট, অ্যাপস নির্মাণ- এসব ক্ষেত্রের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে রয়েছে তরুণ নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতা।
আজ প্রায় সাত লাখ তরুণ ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, সামাজিক উদ্যোক্তা তৈরি কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় তরুণরা এগিয়ে এসেছে অগ্রণী ভূমিকায়। তারা শুধু চাকরি খুঁজছে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। এই উদ্যোক্তা মনোভাবই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতির ভিতকে মজবুত করছে। তরুণ নেতৃত্ব শুধু বয়সে তরুণ নয়; চিন্তায়, দৃষ্টিভঙ্গিতে ও উদ্যোগে তরুণ। তাদের মধ্যে যে গুণাবলিগুলো থাকে, তাই তাদের নেতৃত্বকে সফল করে তোলে- প্রথমত, উদ্যম ও সাহস- তরুণরা ভয় পায় না, ঝুঁকি নিতে জানে, নতুন পথে হাঁটতে জানে।
মিজানুর রহমান মিজান
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
