আমরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির পক্ষে
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যুদ্ধের উন্মাদনায় জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বাসভবনসহ দেশটির বিভিন্ন স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। খামেনিসহ ইরানের শীর্ষনেতাদের বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন। দেশ দুটির যৌথ হামলায় বিপুল ক্ষয়ক্ষতিতে উন্মুক্ত ইরান। প্রতিশোধের আগুনে বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। ইরান আগে থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল তারা আক্রান্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিও নিরাপদ থাকবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান পাল্টাহামলা করেছে সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে। এখন স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের ভূখণ্ডে ইরানি হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও যদি পাল্টা জবাব দিতে আঘাত হানে তাহলে এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে।
পারমাণবিক ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পক্ষের আলোচনা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এই আলোচনা পর্বের মধ্যেই গত বছর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে দেশটির বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে। সে সময়ে যুদ্ধের যে দামামা বেজে উঠেছিল, তা বেশি দূর গড়ায়নি। কিন্তু এবারেও ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার মাঝেই যেভাবে দেশটিতে হামলা চালানো হয়েছে তা সভ্য সমাজের জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে না। এরই মধ্যে বিশ্বের অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ইরানের ওপর ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়ে রাশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী দমিত্রি মেদভেদেভ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলেছেন, ‘শান্তির দূত তার আসল চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন এবার।’ যখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছিল, তখন এমন হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে আমরাও তীব্র নিন্দা জানাই।
পুরো বিশ্ব কয়েক বছর ধরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ফল ভোগ করে চলেছে। দেখছে ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসন। এরই মাঝে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা। তার সঙ্গে বাড়তি যোগ হয়েছে- পাকিস্তান-আফগানিস্তান দ্বন্দ্ব। বার্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন বলছে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার দিনেই আফগানিস্তানের ২২ স্থানে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। এতে নিহত হয় ২৭৪ আফগান যোদ্ধা। অন্যদিকে পাকিস্তানের একটি যুদ্ধবিমান গুলি করে নামানো এবং পাইলটকে জীবিত বন্দি করার দাবি করেছে আফগানিস্তান।
এগত বছর উপমহাদেশের চিরবৈরী দেশ ভারত-পাকিস্তানের মধ্যেও বড় যুদ্ধ জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তবে আশার কথা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় সে সময় বড় যুদ্ধের শঙ্কা থেকে বেঁচে যায় উপমহাদেশ। দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রর প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমার সবচেয়ে গর্বের উত্তরাধিকার হবে শান্তি প্রতিষ্ঠার ভূমিকা।’ কিন্তু ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে তার অবস্থান, কয়েক মাস আগে ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের যে ভূমিকা তাকে কোনোভাবেই শান্তি প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিতবাহী বলা যায় না। ট্রাম্প যেভাবে ইরানের প্রতি ‘আরও ভয়াবহ হামলা আসছে’ এবং দেশটির জনগণকে ক্ষমতা দখলে উস্কে দিচ্ছেন, আমরা মনে করি তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। বিশ্বকে একটি বিপজ্জনক অবস্থার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ কমে যাচ্ছে। অথচ মানব ইতিহাসে সভ্যতার অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে একটি দাবিই স্পষ্ট হয়েছে, আর তা হলো- ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’। কিন্তু সাধারণ মানুষের সেই দাবির প্রতি রাষ্ট্রনায়করা যথাযথ সম্মান দেননি। ফলে যুদ্ধের ভয়াবহতায় আজও পুড়ছে পৃথিবীর নানা প্রান্ত।
বিশ্বের যে প্রান্তেই যুদ্ধ বাধুক না কেন, বিশ্বায়নের এই যুগে সেসব যুদ্ধের অভিঘাত থেকে আমরা কেউই মুক্ত নই। বর্তমানে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে বৈরী অবস্থা তৈরি হয়েছে তাতে আমরাও নিরুদ্বিগ্ন থাকতে পারি না। বর্তমান পৃথিবীতে প্রতিটি দেশের একে অন্যের সঙ্গে রয়েছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক। যুদ্ধের অভিঘাতে সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তাও কারও অজানা নয়। বিশ্বের এক প্রান্তে যুদ্ধ শুরু হলে তার ঢেউ অন্য প্রান্তেও পড়ে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের দক্ষিণে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের কমপক্ষে ৫০ জন নিহত হওয়ার খবর এসেছে, যা আবারও স্পষ্ট করেছে, রণক্ষেত্রে শক্তি পরীক্ষা শুধু অসংখ্য নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের প্রাণই কেড়ে নেয়। দিন শেষে সাধারণ মানুষের জীবনেই বিপর্যয় ডেকে আনে। আর যুদ্ধের প্রভাবে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি তাও শুধু বিবদমান দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্বেই। তাই আমরা মনে করি, হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মানসিকতা পরিহার করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান জরুরি। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকাও জরুরি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে না এলে যুদ্ধ থামবে না। বিশ্বব্যাপী চলমান যুদ্ধগুলোর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য যদি আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তার ভার বর্তমান পৃথিবী কতটা সইতে পারবে, সে বিষয়টিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুধাবন করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যযুদ্ধ প্রলম্বিত হলে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই যুদ্ধ নয়, শান্তির বার্তা প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।
