প্রশাসনের চোখ যেন অন্ধ
নুশরাত জাহান অনন্যা
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো কিংবা সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। একটি দেশ সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয় তখনই যখন সেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং প্রশাসন নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করে। সংবিধান একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনগত দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি বাংলাদেশের সংবিধান, যেখানে সমতা, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের অঙ্গীকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। কাগজে-কলমে এই অঙ্গীকার দৃঢ় ও সুস্পষ্ট। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই আমাদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা থাকলেও সমাজের বিভিন্ন স্তরে আমরা বৈষম্যের চিত্র দেখি। বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।
প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, নির্যাতনের পর হত্যার মতো নির্মম ঘটনা। প্রশ্ন জাগে কোথায় আমাদের প্রশাসন? কোথায় আইনের কার্যকর প্রয়োগ? নারী ও শিশুদের সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশে প্রণীত হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০। এই আইনে ধর্ষণের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে। ২০২০ সালে দেশব্যাপী আন্দোলন ও প্রতিবাদের প্রেক্ষাপটে আইন সংশোধন করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়, যাতে অপরাধীদের জন্য কঠোর বার্তা পৌঁছে যায়। আইনের ভাষা কঠোর, শাস্তির বিধানও স্পষ্ট। তাহলে কেন অপরাধ কমছে না? সমস্যা আইনের কঠোরতায় নয় বরং সমস্যা তার প্রয়োগে।
অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ দায়ের করতে ভুক্তভোগী পরিবারকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। তদন্তে বিলম্ব, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক চাপ কিংবা সামাজিক আপসের সংস্কৃতি বিচারপ্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়। আলামত সংগ্রহে অবহেলা কিংবা সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা মামলাকে দুর্বল করে ফেলে।
বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। এই দীর্ঘসূত্রতা একদিকে যেমন ভুক্তভোগীর পরিবারকে হতাশ করে, অন্যদিকে অপরাধীর মনে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার আশা জাগায়। প্রশাসনের কাজ হলো নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করা এবং অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনা। কিন্তু যখন প্রশাসনের একটি অংশ দলীয় প্রভাব বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আইনের সমতা ভেঙে পড়ে। সাধারণ মানুষ তখন মনে করে প্রশাসনের চোখ যেন অন্ধ। অথচ এই চোখেরই ছিল অন্যায় শনাক্ত করার কথা, দুর্বলকে রক্ষা করার কথা, আইনের শাসন নিশ্চিত করার কথা।
সরকারেরও এখানে দায় রয়েছে। প্রশাসনকে জবাবদিহিতার কাঠামোর মধ্যে রাখা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কঠোর অবস্থান নেওয়া সরকারের দায়িত্ব। যখন এই তদারকিতে শৈথিল্য দেখা দেয়, তখন প্রশাসনের একটি অংশ সুবিধাবাদী হয়ে ওঠে। দলীয় আনুগত্য বা প্রভাবশালীদের প্রতি ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফল ভোগ করে সাধারণ মানুষ। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধটাই মুখ্য হয়। সেখানে আইনের প্রয়োগে কোনো দ্বৈতনীতি থাকে না। একজন সাধারণ নাগরিক যদি নিশ্চিত হতে না পারেন যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে রাষ্ট্র তার পাশে থাকবে, তবে সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আইনের শাসন তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। শুধু কঠোর শাস্তির বিধান যোগ করলেই অপরাধ কমে না।
প্রয়োজন দ্রুত ও দক্ষ তদন্তব্যবস্থা, আধুনিক ফরেনসিক সক্ষমতা, সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। প্রশাসনকে পেশাগত মানোন্নয়নের মাধ্যমে আরও দক্ষ ও মানবিক করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি মামলার অগ্রগতি নিয়মিত তদারকি করতে হবে, যাতে বিলম্ব ও গাফিলতির সুযোগ না থাকে। গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে বিষয় সাময়িক আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো জবাবদিহিতা। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তির বিধান কার্যকর করতে হবে। এতে একদিকে যেমন প্রশাসনের ভেতরে শৃঙ্খলা ফিরবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে। একটি দেশ তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা নিরাপদ বোধ করে। যখন একজন মা নিশ্চিত থাকতে পারেন যে তার সন্তান নিরাপদে স্কুলে যাবে এবং ফিরে আসবে। যখন একজন নারী জানেন যে অন্যায়ের শিকার হলে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন।
এই নিশ্চয়তা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নে আসে না, আসে আইনের সমান প্রয়োগ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং নিরপেক্ষ প্রশাসনের মাধ্যমে। প্রশাসনের চোখ যেন অন্ধ এই বাক্যটি যেন আমাদের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি না হয়ে ওঠে। প্রশাসনের চোখ অন্ধ হওয়ার কথা নয় বরং সেই চোখ হওয়া উচিত সতর্ক, ন্যায়নিষ্ঠ ও নির্ভীক। দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে পেশাগত দায়িত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নিজেদের পদমর্যাদার মর্যাদা রক্ষা করা এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখাই প্রশাসনের প্রধান কর্তব্য। রাষ্ট্রের শক্তি পরিমাপ করা হয় নাগরিকের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে একটি উন্নত ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে দৃঢ়ভাবে প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
ন্যায়বিচার শুধু একটি শব্দ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের আত্মা। সেই আত্মা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে উন্নয়নের সব অর্জনই ম্লান হয়ে যায়। তাই সময় এসেছে অন্ধ নয়, জাগ্রত প্রশাসন গড়ে তোলার। কাগজে নয়, বাস্তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার। তাহলেই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। এত লেখালেখি, এত আন্দোলন, এত প্রাণহানির পরও যদি প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এবং পরিশুদ্ধতা না হয় তাহলে লজ্জা বলা ছাড়া উপায় নাই।
নুশরাত জাহান অনন্যা
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
