অগ্নিনির্বাপণে চাই সতর্কতা ও সামাজিক সচেতনতা

ওসমান গনি

প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে ঋতুচক্রের আবর্তনে শীত তার হিমেল পরশ নিয়ে বিদায় নিয়েছে। পঞ্জিকার পাতায় এখন বসন্তের রাজত্ব। প্রকৃতিতে বইছে দখিনা হাওয়া, কিন্তু এই হাওয়ার সঙ্গে মিশে আছে এক রুক্ষতা ও শুষ্কতা। দিনের বেলা সূর্যের প্রখরতা যত বাড়ছে, চারপাশের পরিবেশ তত বেশি দাহ্য হয়ে উঠছে। মাঠের ঘাস, গাছের ঝরা পাতা থেকে শুরু করে বাঁশ-কাঠের স্তূপ- সবই এখন সামান্য আগুনের সংস্পর্শে এলেই জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় থাকে। এই শুষ্ক মৌসুমে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় আগুনের প্রসারণ ঘটে অতি দ্রুত। সামান্য একটি বিড়ি-সিগারেটের অবশিষ্টাংশ কিংবা রান্নার চুলার অবহেলা থেকে মুহূর্তের মধ্যে লেলিহান শিখা আকাশ স্পর্শ করে। আমাদের দেশে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে অগ্নিকাণ্ডের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পেছনে জলবায়ুগত এই রুক্ষতা অনেকটা দায়ী থাকলেও, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সিংহভাগ ঘটনার মূলে রয়েছে মানুষের তৈরি করা অবহেলা এবং অসাবধানতা। একটি সাজানো সংসার, তিল তিল করে গড়ে তোলা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা তিলে তিলে জমানো সঞ্চয় ছাই হয়ে যেতে কয়েক মিনিটের বেশি সময় লাগে না। অগ্নিকাণ্ড এখন শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের জীবনের এক নিয়মিত দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ডের হার যে হারে বেড়েছে, তা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বড় উদ্বেগ। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২০ সাল থেকে পরবর্তী ছয় বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১,৪৮,৭৪৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই বিশাল সংখ্যাটি শুধু একটি তথ্য নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের নিরাপত্তাহীনতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। এই ছয় বছরে অগ্নিকাণ্ডের ফলে যে পরিমাণ জাতীয় সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সম্পদের চেয়েও বড় ক্ষতি হলো অমূল্য প্রাণের বিনাশ। একটি অগ্নিকাণ্ড মানে শুধু দালানকোঠা পুড়ে যাওয়া নয়, এটি একটি পরিবারের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। দেশে প্রতিবছর অগ্নিকাণ্ডের কারণে কয়েক হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করছে এবং অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হয়ে পথে বসছে। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, আমরা আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে অগ্নিনিরাপত্তাকে চরমভাবে উপেক্ষা করছি। আমাদের এই উদাসীনতা অপরাধের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে এখন গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ সামনে আসছে। বর্তমান সময়ে আমাদের জীবনযাত্রার ধরণ আমূল বদলে গেছে। রান্নার কাজে কাঠের চুলার পরিবর্তে শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এখন এলপিজি সিলিন্ডার পৌঁছে গেছে। গ্যাস সিলিন্ডার আমাদের জীবনকে সহজ ও আধুনিক করলেও এর সঠিক ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা অত্যন্ত সীমিত। দেশের প্রায় প্রতিটি ঘরেই এখন এই সিলিন্ডারগুলো একটি ‘টাইম বোমার’ মতো অবস্থান করছে। সিলিন্ডার কোম্পানিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা থাকলেও তারা কতটুকু গুণগত মান রক্ষা করছে, তা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মুনাফার লোভে অতি নিম্নমানের এবং পাতলা ধাতব পাত দিয়ে সিলিন্ডার তৈরি করা হয়, যা উচ্চ চাপের গ্যাস সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। তার চেয়েও ভয়ংকর বিষয় হলো সিলিন্ডারের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার। মানুষ বছরের পর বছর একই সিলিন্ডার ব্যবহার করে যাচ্ছে কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই। সিলিন্ডারের গায়ে মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ থাকলেও সাধারণ ব্যবহারকারীরা তা পরীক্ষা করেন না। লোহা বা স্টিলের তৈরি এই পাত্রগুলো নিয়মিত ব্যবহারে ঘর্ষণ বা জলীয় বাষ্পের কারণে ক্ষয়ে যায় এবং একসময় তা বিস্ফোরিত হয়ে বিভীষিকা ছড়ায়।

বৈদ্যুতিক অব্যবস্থাপনা অগ্নিকাণ্ডের আরেকটি প্রধান ক্ষেত্র। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে কুমিল্লার চান্দিনায় দৈনিক কালবেলা পত্রিকার সাংবাদিক আকিবুল ইসলাম হারেছ এর বাড়িতে বৈদ্যুতিক মিটার বিস্ফোরণ থেকে যে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার ভঙ্গুর অবস্থাকেই স্পষ্ট করে। গভীর রাতে যখন মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন এই যান্ত্রিক বিচ্যুতি মুহূর্তের মধ্যেই ৯টি ঘরকে ভস্মীভূত করে দেয়। প্রায় ৩৫ লাখ টাকার সম্পদ নিমিষেই ছাই হয়ে যায়। এই ঘটনাটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, বিপদ কতটা কাছে ওত পেতে আছে। আমরা বাড়ি বানানোর সময় টাইলস বা রঙের পেছনে লাখ লাখ টাকা খরচ করি, কিন্তু মানসম্মত বৈদ্যুতিক তার বা সার্কিট ব্রেকার কেনার ক্ষেত্রে অনেক সময় সস্তা খুঁজছি। পুরনো ভবনগুলোতে কয়েক দশক আগের ওয়্যারিং দিয়ে আজও বিদ্যুৎ চালানো হচ্ছে, অথচ বর্তমান সময়ে বৈদ্যুতিক লোড অনেক বেড়েছে। এসি, ফ্রিজ, মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ভার বহন করতে না পেরে তারগুলো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং শর্টসার্কিটের মাধ্যমে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি বিস্ফোরণ এখন এক নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ওসমান গনি

সাংবাদিক ও কলামিস্ট