যুদ্ধের করাল গ্রাস ও দোদুল্যমান অর্থনীতি
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক সংকট, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ শুধু মানচিত্রের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট পর্যন্ত। যুদ্ধের দামামা যখনই বাজে, তখনই মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে, তা হলো অর্থনীতির ধস। একটি দেশের অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক নয়, বরং এটি কয়েক প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।
যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব হলো ভৌত অবকাঠামোর বিনাশ। রাস্তাঘাট, সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কারখানাগুলো যখন বোমাবর্ষণে ধূলিসাৎ হয়, তখন একটি দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। সরবরাহ ব্যবস্থা (Supply Chain) ভেঙে যাওয়ার ফলে শিল্প উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদাই অপূর্ণ থাকে না, বরং রপ্তানি বাণিজ্য সংকুচিত হয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ে। কোনো দেশের কয়েক দশকের উন্নয়ন এক লহমায় ধুলোয় মিশে যাওয়া মানে হলো অর্থনীতিকে আবার শূন্য থেকে শুরু করা, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ।
যুদ্ধের পরোক্ষ কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব হলো অগ্নিমূল্য বা উচ্চ মূল্যস্ফীতি। যুদ্ধের ফলে জোগান ও চাহিদার মধ্যে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যায়। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হলে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে প্রতিটি প্রতিটি খাদ্যপণ্যের ওপর। যখন কোনো দেশ আমদানিনির্ভর হয়, তখন বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে মুদ্রার মান কমে যায় (Devaluation), ফলে দেশীয় বাজারে পণ্য কিনতে মানুষকে হিমশিম খেতে হয়। ক্ষুধার্ত নাগরিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া একটি রাষ্ট্রের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক অস্থিরতারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যুদ্ধকালীন অবস্থায় একটি সরকারকে বাধ্য হয়ে বাজেটের বড় একটি অংশ প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ করতে হয়। যে অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি বা অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হতে পারত, তা ব্যয় হয় গোলাবারুদ ও সমরসম্ভার কেনায়। এই ‘সুযোগ ব্যয়’ (Opportunity Cost) দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে গিয়ে সরকার প্রায়ই অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে। এই ঋণের বোঝা ও সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে পরবর্তী কয়েক বছরের উন্নয়ন বাজেট কাটছাঁট করতে হয়, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক প্রকার মরণফাঁদ।
অর্থনীতি সচল রাখার জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ ও বিনিয়োগকারীর আস্থা অত্যন্ত জরুরি। যুদ্ধ বা যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা (FDI) মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং স্থানীয় উদ্যোক্তারাও মূলধন সরিয়ে নিতে শুরু করে। একে বলা হয় ‘ক্যাপিটাল ফ্লাইট’ বা পুঁজি পাচার। এর পাশাপাশি যুদ্ধকালীন অস্থিরতায় দেশের মেধাবী জনগোষ্ঠী ও দক্ষ শ্রমিকরা উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়তে শুরু করে। এই ‘ব্রেইন ড্রেন’ বা মেধা পাচার একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। দক্ষ জনশক্তির অভাব পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে আরও মন্থর করে তোলে।
আজকের বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বা মধ্যপ্রাচ্যের সংকট প্রমাণ করেছে যে, যুদ্ধ যদি সুদূর কোনো প্রান্তেও হয়, তার প্রভাব পড়ে সারা বিশ্বে। গম, সার ও জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার যখন অস্থিতিশীল হয়, তখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং পর্যটন খাতের মতো স্পর্শকাতর খাতগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে। ফলে স্থানীয় যুদ্ধ অনেক সময় বৈশ্বিক মন্দার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
পরিশেষে বলা যায়, যুদ্ধের কোনো জয়ী পক্ষ নেই; পক্ষান্তরে অর্থনীতিই হয় সবচেয়ে বড় পরাজিত। গোলার আঘাতে ভবন মেরামত করা সম্ভব হলেও, ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামো এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান পুনরুদ্ধার করতে কয়েক দশক সময় লেগে যায়। শান্তি কেবল মানবিকতার খাতিরেই নয়, বরং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থানের জন্যও অপরিহার্য। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, কামানের গর্জন বন্ধ হওয়ার পরও ক্ষুধার যে দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ভাসে, তা মিটানো কোনো সমরনায়কের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই যুদ্ধের পথ পরিহার করে কূটনীতি ও সহাবস্থানের মাধ্যমেই একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।
