বইমেলা হোক তরুণদের মিলনমেলা

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক প্রেক্ষাপট এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিমুখতা এবং নৈতিক অবক্ষয় যখন আমাদের ভবিষ্যতের সামনে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন বইমেলা হতে পারে সেই দেওয়াল ভাঙার অন্যতম হাতিয়ার। বই কেবল তথ্যের আধার নয়, বরং তা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রধান মাধ্যম। একুশের অমর বইমেলা আজ কেবল কেনাবেচার মেলা নয়, বরং তা তরুণ প্রজন্মের মননশীলতাকে শাণিত করার এক বিশাল মঞ্চ। কবির ভাষায়- ‘বই পড়লে মানুষ বড় হয়, আর বই না পড়লে দেশ অন্ধ হয়।’

তরুণদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা যেকোনো জাতির দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বর্তমান ডিজিটাল আসক্তির যুগে কিশোররা যখন স্ক্রিনে বন্দি, তখন মেলার ধুলোবালি আর বইয়ের ঘ্রাণ তাদের ফিরিয়ে আনতে পারে বাস্তব জগতে। বই পড়ার অভ্যাস মানুষকে ধৈর্যশীল করে এবং গভীর চিন্তা করতে শেখায়। বাংলা একাডেমির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, প্রতিবছর মেলায় আসা নতুন বইয়ের সিংহভাগই তরুণ পাঠকদের উদ্দেশ্য করে লেখা, যা তাদের সৃজনশীল চিন্তার খোরাক জোগায়।

জীবনের প্রকৃত মানে খুঁজে পেতে সাহিত্য এক অনন্য দিশারি। কিশোর গ্যাংয়ের অন্ধ গলিতে পা বাড়ানো তরুণরা যখন কালজয়ী উপন্যাস বা আত্মজীবনী পড়ে, তখন তারা বুঝতে পারে ধ্বংস নয় বরং সৃষ্টিই জীবনের স্বার্থকতা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘অন্তরের সম্পদই মানুষের চরম সম্পদ।’ বই পড়ার মাধ্যমে এই আত্মিক সম্পদ অর্জন করা সম্ভব, যা তরুণদের বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করে তাদের জীবনের একটি ইতিবাচক লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়।

বর্তমানে পাড়া-মহল্লায় নেতিবাচক আড্ডা ও গ্যাং কালচারের বিস্তার ঘটছে আশঙ্কাজনক হারে। বইমেলা এই তরুণদের এক সুস্থ আড্ডার পরিবেশ দেয়। যখন কোনো তরুণ বন্ধুকে নিয়ে মেলায় আসে, তখন তার আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে কোনো নতুন লেখক বা সমকালীন বিষয়। এই ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো আমাদের সমাজ থেকে ক্ষতিকর আড্ডা কমিয়ে মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে। গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে অপরাধপ্রবণতা প্রায় ৭০ শতাংশ হ্রাস পায়।

সৃজনশীলতার বিকাশ সাধনে বইমেলার কোনো বিকল্প নেই। মেলায় শুধু বই কেনাই হয় না, বরং লেখক-পাঠক আড্ডা ও সেমিনার তরুণদের চিন্তাশক্তিকে শাণিত করে। তারা নতুন শব্দ শেখে, নতুন পৃথিবী দেখে এবং নিজের ভেতর এক ধরনের নান্দনিক বোধ লালন করে। এই সৃজনশীলতাই তাদের গতানুগতিক পড়াশোনার বাইরে গিয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। ‘জ্ঞানই শক্তি’- এই আপ্তবাক্যটি মেলায় আগত তরুণদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে। মানবিক মূল্যবোধের জাগরণ ঘটে সুকুমার বৃত্তির চর্চায়। বর্তমান তরুণদের একটি বড় অংশ সহমর্মিতা ও নৈতিকতার সংকটে ভুগছে। সাহিত্যের চরিত্রগুলো পাঠকদের অন্য মানুষের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। বইমেলায় এসে যখন একজন শিক্ষার্থী বিভিন্ন ঘরানার বই সংগ্রহ করে, তখন সে আসলে সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের দীক্ষা নেয়। এই মানবিক গুণাবলিই তাকে ভবিষ্যতে একজন পরোপকারী ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।

সময় অপচয় রোধ করার ক্ষেত্রে বইমেলা এক নীরব বিপ্লব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অর্থহীন সময় কাটানোর চেয়ে একটি ভালো বইয়ের পৃষ্ঠা ওল্টানো অনেক বেশি ফলপ্রসূ। মেলা চলাকালীন তরুণরা তাদের অবসর সময় বইয়ের মাঝে কাটায়, যা তাদের মস্তিষ্ককে সচল রাখে এবং অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ‘সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না’- এই চরম সত্যটি বই পড়ুয়ারা সবচেয়ে ভালো অনুধাবন করতে পারে।

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনই আমাদের আগামীর প্রধান চ্যালেঞ্জ। বর্তমানের ‘অশিক্ষিত নেতা’ হওয়ার প্রবণতা রোধ করতে হলে তরুণদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার চেয়েও বেশি প্রয়োজন মেধা ও প্রজ্ঞা। বইমেলা তরুণদের ইতিহাসের সঠিক পাঠ দেয়, যা তাদের যুক্তিবাদী করে তোলে। তথ্যবহুল বই পড়ার মাধ্যমে তারা রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পায়, যা ভবিষ্যতে একটি শিক্ষিত ও যোগ্য নেতৃত্ব উপহার দিতে সক্ষম। অপরাধপ্রবণতা হ্রাসে বই এক অমোঘ ওষুধ। কিশোররা যখন অপরাধের পথে পা বাড়ায়, তখন তারা মূলত মানসিক একঘেঁয়েমি বা ভুল রোমাঞ্চের শিকার হয়। বইমেলা তাদের সামনে সাহিত্যের এক রোমাঞ্চকর জগৎ খুলে দেয়। যখন একটি ছেলে বা মেয়ে বই পড়ার নেশায় বুঁদ হয়, তখন তার কাছে অস্ত্র বা মাদক তুচ্ছ হয়ে যায়। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চাই পারে সমাজ থেকে এই অন্ধকার দূর করতে।

গুস্থ সংস্কৃতিচর্চার পীঠস্থান হলো একুশের বইমেলা। এটি শুধু বইয়ের সমাহার নয়, এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের ধারক। মেলায় গান, কবিতা আবৃত্তি এবং চিত্রাঙ্কনের মতো বিষয়গুলো তরুণদের মনের কালিমা ধুয়ে দেয়। আমাদের লোকজ সংস্কৃতি ও দেশজ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে তারা শেকড়ের সন্ধান পায়। অপসংস্কৃতির প্রবল স্রোতে গা না ভাসিয়ে তরুণরা তখন নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করতে শেখে।

আদর্শ নাগরিক বোধ তৈরি হয় দায়িত্বশীল চিন্তা থেকে। বইমেলা তরুণদের শিখিয়ে দেয় দেশপ্রেম মানে শুধু স্লোগান নয়, বরং দেশের ইতিহাস ও ভাষাকে ভালোবাসা। যারা বই পড়ে, তারা জানে যে একটি জাতির অস্তিত্ব তার ভাষার ওপর দাঁড়িয়ে। ভাষা আন্দোলনের বীরদের আত্মত্যাগের ইতিহাস পাঠ করে তরুণরা বুঝতে পারে তাদের দায়িত্ব কতটুকু। ইত্তেফাকের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, পাঠাগার বিমুখ জাতি কখনও উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না।

চিন্তাশক্তির প্রসার সাধনই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। প্রচলিত পাঠ্যবই অনেক সময় শিক্ষার্থীদের গণ্ডিবদ্ধ করে ফেলে, কিন্তু মেলায় আসা বৈচিত্র?্যময় বইগুলো তাদের মহাকাশ থেকে গভীর সমুদ্র- সব জায়গার সংবাদ দেয়। এই জ্ঞান অর্জনে উৎসাহী হওয়া মানেই হলো ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেকে প্রস্তুত করা। বিজ্ঞান ও দর্শনের বইগুলো তরুণদের অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত করে যুক্তিবাদী ও আধুনিক মানুষে পরিণত করে।

নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস দেয় বই। হতাশায় নিমজ্জিত যুবসমাজ যখন মহৎ প্রাণ ব্যক্তিদের জীবনী পড়ে, তখন তারা নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পায়। ‘স্বপ্ন সেটা নয় যা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটা যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না’ এপিজে আব্দুল কালামের এই উক্তি তরুণরা শুধু বইয়ের পাতাতেই খুঁজে পায়। বইমেলা তাদের সেই স্বপ্নের বীজ বপন করার জায়গা, যা ভবিষ্যতে মহীরুহ হয়ে সমাজকে ছায়া দেবে।

ইতিবাচক মানসিকতা গঠন ও মেধার সঠিক বিকাশ বইমেলার অন্যতম দান। আজকাল তুচ্ছ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে সহিংস মনোভাব দেখা যায়, তা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো সুস্থ বিনোদন ও জ্ঞানচর্চা। বইমেলায় বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়। বন্ধুত্বের ভিন্ন এক সংজ্ঞা তারা পায় বইয়ের পাতায়- যেখানে বই-ই হয় মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নীরব বন্ধু।

নৈতিক শিক্ষা অর্জন ও শিক্ষকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বই পড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা গুরুজনদের মর্যাদা এবং বড়দের প্রতি সৌজন্যবোধ শেখে। প্রাচীন সাহিত্য থেকে আধুনিক প্রবন্ধ- সবখানেই জ্ঞানদাতাদের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে। বইমেলা শিক্ষার্থীদের মনে এই বোধ জাগ্রত করে যে, শুধুমাত্র সনদ অর্জনেই জীবন সার্থক নয়, নৈতিকতা ও বিনয়ই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি।

দেশপ্রেম ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মেধা পাচার রোধ এবং দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করা সম্ভব। মেলায় প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইগুলো নতুন প্রজন্মকে আমাদের স্বাধীনতার মূল্য বোঝাতে সক্ষম। তারা যখন নিজের দেশের মাটির ঘ্রাণ পায় শব্দের বুননে, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। এই সচেতনতাই তাদের আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশের কারিগর হিসেবে গড়ে তুলবে।

পরিশেষে বলা যায়, বইমেলা শুধু এক মাসের আয়োজন নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রক্রিয়া। কিশোর গ্যাং ও শিক্ষাবিমুখতার এই আঁধার কাটাতে বই হোক আমাদের একমাত্র আলো। তরুণদের মিলনমেলা যদি বইয়ের সঙ্গে হয়, তবেই গড়ে উঠবে শিক্ষিত ও উন্নত আগামীর বাংলাদেশ। তাই আসুন, স্লোগান তুলি- ‘বই পড়ি, স্বদেশ গড়ি।’ বইয়ের প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে থাকা জীবনের সঠিক পথনির্দেশ গ্রহণ করে আমরা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাই।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল