গার্মেন্টস শিল্পে নারীর ক্ষমতায়ন : অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম

প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গার্মেন্টস শিল্প আজ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে বিকশিত এই শিল্প বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ যোগান দিচ্ছে এবং জাতীয় আয়ের প্রায় ১০-১৩ শতাংশ অবদান রাখছে বলে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। এই সাফল্যের পেছনে যে শক্তি নীরবে, ধারাবাহিকভাবে কাজ করছেন, তারা হলেন লাখো নারী শ্রমিক। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের ইতিহাস আসলে নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক পরিবর্তন ও সংগ্রামের ইতিহাস। দেশকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের এক চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছেন। ১৯৮০-এর দশকে যখন বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের উত্থান শুরু হয়। তখন গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের জন্য এটি ছিল প্রথম বৃহৎ আকারের বেতনভিত্তিক কর্মসংস্থান। বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্প-সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে গার্মেন্টস খাতে প্রায় ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন, যার মধ্যে প্রায় ৫০-৬০ শতাংশই নারী। একসময় এই হার ৭০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। শিল্পটির সম্প্রসারণের সঙ্গে নারীর শ্রমশক্তির একটি ঐতিহাসিক সংযুক্তি তৈরি হয়েছে। এটা শুধু একটি সংখ্যা নয়। দেশের এক বিশাল সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক। এই শিল্প নারীদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল? গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল। গ্রামের সমাজে বহু পরিবারে মেয়েরা আগে স্কুল শেষে পড়াশোনাই ছেড়ে দিত। গার্মেন্টস শিল্পে কর্মসংস্থান পাওয়া অর্থপূর্ণ আয়, আত্মণ্ডস্বাধীনতা এবং সামাজিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ এনে দিয়েছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নারীদের কাজ ছিল অদৃশ্য ও অস্বীকৃত। গার্মেন্টস শিল্প নারীদের প্রথমবারের মতো নগদ আয়ের সুযোগ করে দিয়েছে। যা তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে বিপুল পরিবর্তন আনতে সহায়ক। বহু পরিবারে মেয়েরা গৃহে বসে নির্ভরশীল থেকে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রণেতা হিসেবে এগিয়ে এসেছে। নারী শ্রমিকদের উপার্জন শুধু ব্যক্তিগত স্বাধীনতাই বাড়ায়নি। পরিবারের অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে দিয়েছে। গার্মেন্টস কর্মী নারীরা তাদের আয়ের বড় অংশ পরিবারে পাঠান। ভাইবোনের পড়াশোনা, বাবা-মায়ের চিকিৎসা, ঘর মেরামত, ঋণ পরিশোধ কিংবা জমি কেনায় ব্যয় করেন। ফলে তারা পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়াও নারীর হাতে আয় আসার ফলে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে।

ইদানিং বাল্যবিবাহের হার কিছু ক্ষেত্রে কমেছে। দিন দিন মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে। পরিবারে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীর আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পেয়েছে। গার্মেন্টস কর্মীদের বড় অংশই মেধা-শক্তি-সম্পন্ন চিত্ত শ্রমিক হলেও তারা প্রাথমিকভাবে নিচু-স্তরের কাজের জন্য নিয়োজিত ছিলেন। শিল্পে নারীর বড় অংশ সেলাই বা কার্যকরী স্তরে। আর মাত্র ১০ শতাংশ এর কমই তৃণমূল পর্যায়ের ঊর্ধ্বস্তরে রয়েছেন। নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে গত তিন দশকে যে দারিদ্র্য হ্রাসের হার লক্ষ্য করা গেছে, তার একটি বড় কারণ গার্মেন্টস খাতের সম্প্রসারণ। গার্মেন্টস শিল্প নারীদের ঘরবন্দি জীবন থেকে বের করে এনেছে। গ্রাম থেকে শহরে এসে কাজ করার মাধ্যমে তারা নতুন সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। নগর জীবনের অভিজ্ঞতা, সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক, শ্রমিক সংগঠনের ধারণা পেয়েছেন। সব মিলিয়ে নারীদের সামাজিক চেতনা ও সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় সমাজে মেয়েদের বাইরে কাজ করাকে নেতিবাচক চোখে দেখা হতো। আজ সেখানে গার্মেন্টস কর্মী হওয়া অনেক পরিবারের জন্য গর্বের বিষয়। এই পরিবর্তন ধীরে হলেও স্থায়ী প্রভাব ফেলছে।

দুঃখজনক বিষয় নারীদের অংশগ্রহণ গত কয়েক বছরে কমেছে, বিশেষত ১৮-৩৫ বছরের মধ্যে। এর পেছনে কিছু মৌলিক কারণ আছে। স্বামী বা পরিবারের চাপ নারীদের উচ্চশিক্ষা বা অন্যান্য ব্যবসায় প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। অটোমেশন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ শ্রমিকের কাজ বাড়িয়েছে বা নারীদের থেকে প্রকৃতিতে আলাদা কাজ চেয়েছে, যার ফলে নারীর অংশ কমছে। বাড়তি দায়িত্ব বা পরিবার-সংক্রান্ত বাধা নারীদের দীর্ঘমেয়াদি চাকরি ধরে রাখা কঠিন করছে। গার্মেন্টস শিল্প নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্র তৈরি করলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ মসৃণ নয়। নারীরা প্রধানত নিম্নপদে- সেলাই অপারেটর, হেলপার, ফিনিশিং কর্মী হিসেবে নিয়োজিত। ব্যবস্থাপনা বা তদারকি পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত কম। উৎপাদনের মূলভিত্তি নারী হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে তারা প্রান্তিক। অনেক ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকেরা দীর্ঘ কাজের পরেও যৌন হেনস্থা, নিরাপত্তাহীনতা বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ শর্তে কাজ করছেন। যা কর্মক্ষেত্রে নারীর সুরক্ষাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। গার্মেন্টস শিল্পে মজুরি বৈষম্য একটি অন্যতম সমস্যা। একই ধরনের কাজ করেও অনেক ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় কম মজুরি পাচ্ছেন বা পদোন্নতির সুযোগ কম। যদিও সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি কাঠামো রয়েছে। বাস্তবে ওভারটাইম, ইনক্রিমেন্ট, গ্রেড নির্ধারণে বৈষম্যের অভিযোগ উঠছে। এসব চ্যালেঞ্জ শুধুই নির্দিষ্ট শিল্পের সমস্যা নয়। এটি আমাদের দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক স্তর মিলিয়ে ব্যাপক গতিশীল ইস্যু। দীর্ঘ কর্মঘন্টা, অতিরিক্ত ওভারটাইম, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন সুবিধা বাস্তবায়নে অনেক কারখানায় ঘাটতি দেখা যায়। শিশুসন্তান লালন-পালনের জন্য পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার সুবিধাও সীমিত। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের ঘটনা বিশ্বব্যাপী দেশের গার্মেন্টস শিল্পকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনে। এই দুর্ঘটনায় হাজারের বেশি শ্রমিক প্রাণ হারান, যাদের বড় অংশই নারী ছিলেন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপ ও দেশীয় সংস্কারের ফলে কর্মপরিবেশ উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম

শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়