সমঅধিকার, আস্থা ও উন্নয়নই পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই শান্তির একমাত্র পথ
এম মহাসিন মিয়া
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড়, অরণ্য আর নদীনালায় ঘেরা পার্বত্য চট্টগ্রাম বহু জাতিগোষ্ঠীর আবাসস্থল। যাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনধারা দেশের সামগ্রিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু সম্ভাবনায় ভরপুর এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে নানা অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও বঞ্চনার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ফলে প্রশ্ন জাগে কীভাবে নিশ্চিত হবে টেকসই শান্তি উত্তর একটাই, সমঅধিকার, পারস্পরিক আস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন।
প্রথমত, সমঅধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি কল্পনা করা যায় না। সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে সমান অধিকার দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে পাহাড়ের বহু মানুষের মনে এখনও বঞ্চনার অনুভূতি রয়ে গেছে। ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা, প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য, এসব বিষয় সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ অপরিহার্য। সমঅধিকার মানে শুধু আইনি স্বীকৃতি নয়, এর অর্থ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার বাস্তব প্রতিষ্ঠা। পাহাড়ে বসবাসকারী সব জাতিগোষ্ঠী, উপজাতি ও বাঙালি সবার জন্য সমান সুযোগ ও ন্যায্য অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি ও প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হলে এই অধিকার বাস্তব রূপ পাবে।
দ্বিতীয়ত, আস্থা বা বিশ্বাসের পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সংঘাত ও বিভাজনের ইতিহাস মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি করেছে। এই দূরত্ব কমাতে প্রয়োজন সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বচ্ছতা। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত ও খোলামেলা আলোচনার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। ভুল বোঝাবুঝি বা গুজব যেন সংঘাতে রূপ না নেয়, সে জন্য তথ্যপ্রবাহকে স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল করতে হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা নীতিগত সিদ্ধান্ত, সবকিছুতেই জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ ও ব্যাখ্যার সুযোগ থাকলে আস্থার ভিত্তি মজবুত হবে।
তৃতীয়ত, উন্নয়ন হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা প্রকল্প ঘোষণা শান্তি নিশ্চিত করে না। উন্নয়ন তখনই কার্যকর হয় যখন তা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে। পাহাড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রতি সচেতন থেকে উন্নয়ন করতে হবে, যাতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট না হয়। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করলে হতাশা ও বিভ্রান্তির জায়গা সংকুচিত হবে। নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও টেকসই শান্তির ভিত্তি শক্ত করবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও কার্যকর জবাবদিহি থাকলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে কার্যকর ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের অবসান ঘটে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা আস্থা তৈরির অন্যতম পূর্বশর্ত।
সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক পরিচিতি বৃদ্ধিও শান্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উৎসব, ভাষা ও ঐতিহ্যকে জাতীয় পরিসরে সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়া হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়বে। শিক্ষা ব্যবস্থায় বহুসাংস্কৃতিক চেতনা অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নতুন প্রজন্ম বৈচিত্র্যকে বিভাজন নয়, শক্তি হিসেবে দেখবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন, যাতে বিভ্রান্তিকর তথ্য বা বিদ্বেষমূলক প্রচার অস্থিরতা না বাড়ায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও উন্নয়ন কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সরকার, স্থানীয় নেতৃত্ব, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই স্থায়ী সমাধান সম্ভব। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, আইনের প্রতি আনুগত্য এবং উন্নয়নের সুফল সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টনের মাধ্যমে একটি নতুন আস্থার পরিবেশ তৈরি করা যায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে আর ‘সমস্যার অঞ্চল’ হিসেবে দেখার সময় শেষ। এটিকে দেখতে হবে ‘সম্ভাবনার’ অঞ্চল হিসেবে। যেখানে পাহাড়, মানুষ ও রাষ্ট্র মিলেমিশে একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে। সমঅধিকার নিশ্চিত হলে মানুষ নিজেকে রাষ্ট্রের অংশ মনে করবে। আস্থা তৈরি হলে বিভাজনের দেয়াল ভাঙবে, আর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বাস্তবায়িত হলে শান্তি হবে স্থায়ী। তাই বলা যায়, সমঅধিকার, আস্থা ও উন্নয়ন, এই তিন স্তম্ভের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই শান্তির ভিত্তি।
এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক, লেখক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক
