গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা প্রয়োজন

মুহিবুল হাসান রাফি

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানী ও বন্দর নগরী চট্টগ্রামের চিরচেনা যানজট আর গণপরিবহণের বিশৃঙ্খল অবস্থা এখন আর শুধু বিড়ম্বনার কারণ নয়, বরং জননিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনের যাতায়াতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।

বাসগুলোর ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোর বেপরোয়া চলাচলের কারণে ঢাকা যেন এক বিশৃঙ্খল নগরীতে পরিণত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গণপরিবহণে শৃঙ্খলা ফেরাতে যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং জনআকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। এছাড়া তিনি নারীদের জন্য পৃথক বাস সর্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। তাছাড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন যা উদ্যোগ নিয়েছে তা প্রশংসনীয়। মূলত কার্যকর হচ্ছে কতটুকু তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

গত সোমবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে নিদের্শনা দেন। রাজধানী কিংবা চট্টগ্রাম নগরীতে প্রধান সড়কগুলোতে চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা, রাস্তার মধ্যখানে হঠাৎ ব্রেক চেপে যাত্রী নামানো বা ওঠানো কিংবা দীর্ঘক্ষণ মোড় দখল করে দাঁড়িয়ে থাকা নিত্যদিনের ঘটনা। এর ওপর ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে লাইসেন্সবিহীন ও নিয়মবহির্ভূতভাবে চলাচলকারী অটোরিকশাগুলো। এসব বাহন ট্রাফিক সিগন্যাল মানে না, এমনকি উলটো পথে চলাটাকেও তারা অধিকারে পরিণত করেছে।

ফলে শুধু যানজটই বাড়ছে না, অকালে ঝরছে প্রাণ। গণপরিবহণে চলাচলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয় নারীদের। তাদের নিরাপদে চলাচলের জন্য ভালো কোনো গণপরিবহণ নেই। বস্তুত রাজধানী ও চট্টগ্রাম নগরীর সড়কে মানসম্মত গণপরিবহণ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। আশার কথা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটিতে দৃষ্টি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এ ক্ষেত্রে আমরা মনে করি, গণপরিবহণে শৃঙ্খলা ফেরাতে কোনো ধরনের আপস করা উচিত হবে না। সড়কের অরাজকতা বন্ধে সরকারকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে সচেষ্ট ও কঠোর হতে হবে। কারণ, আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, শুধু নির্দেশনা বা ঘোষণা দিয়ে এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে আইনের যথাযথ ও বৈষম্যহীন প্রয়োগ। পরিবহণ মালিক ও শ্রমিক নেতাদের প্রভাবশালী চক্র অনেক সময় আইন প্রয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই বৃত্ত ভাঙাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে শুধু বাস চালকদের জরিমানা করলেই চলবে না, বরং পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। বাস রুট র‍্যাশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচলের ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করতে হবে, যাতে চালকদের মধ্যে যাত্রী ধরার অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়। রাজধানী ও চট্টগ্রাম নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে রিকশা ও অটোরিকশা চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং অবৈধ যানবাহনের উৎস বন্ধ করতে হবে। ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় করা এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনকারীদের তাৎক্ষণিক জরিমানার আওতায় আনতে হবে।

চালক ও সহকারীদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতন করা এবং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করাও জরুরি।

চট্টগ্রাম নগরী ও রাজধানীর পরিবহণ খাতকে জিম্মি করে রাখা স্বার্থান্বেষী মহলের চেয়ে জনস্বার্থ অনেক বড়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়, সিটি কর্পোরেশন এবং বিআরটিএ-কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রীর এই সদিচ্ছার সুফল নগরবাসী দ্রুত পাবে। শৃঙ্খলাহীন নয়, আমরা একটি নিরাপদ ও গতিশীল বাংলাদেশ দেখতে চাই।

মুহিবুল হাসান রাফি

সাংবাদিক ও কলামিস্ট