টেকসই কৃষি উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ করণীয়
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অর্থনীতির প্রকৃত ভিত্তি খুঁজতে হলে তাকাতে হবে কৃষির দিকে। কারণ এই খাতই খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। দেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প ও সেবা খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধির ফলে মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষির অংশ কিছুটা কমলেও এর কৌশলগত গুরুত্ব কমেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি খাত জিডিপির প্রায় ১১-১৩ শতাংশ অবদান রাখছে। কিন্তু কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এর অংশীদারিত্ব অনেক বেশি। প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ শ্রমশক্তি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এই বৈপরীত্য একটি মৌলিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে।
কৃষিতে উৎপাদনশীলতা এখনও তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু জীবিকার ক্ষেত্রে এটি অপরিহার্য। কৃষির স্থিতিশীলতা মানেই সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। দেশের কৃষি কাঠামো মূলত ধানকেন্দ্রিক। উর্বর পলিমাটি, নদীবিধৌত ভূপ্রকৃতি এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাত কৃষির জন্য বরাবর প্রাকৃতিক সুবিধা সৃষ্টি করেছে। উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহার, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগের ফলে গত কয়েক দশকে খাদ্যশস্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। একসময় খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশ আজ অনেক ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে। বিশেষ করে বোরো ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমানে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। তবে কৃষি খাতের অবদান শুধু খাদ্যশস্যে সীমাবদ্ধ নয়। সবজি, ফল, মাছ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও ফুলচাষ- সব মিলিয়ে কৃষি এখন বহুমাত্রিক। মাছ উৎপাদনে আমরা বৈশ্বিকভাবে অন্যতম শীর্ষ দেশ হিসেবে পরিচিত। অভ্যন্তরীণ জলাশয় ও চাষভিত্তিক মৎস্য খাত গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রাণিসম্পদ খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদনে দেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। পোলট্রি ও ডেইরি শিল্প গ্রামীণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি করছে এবং নারীর অংশগ্রহণও বাড়াচ্ছে। কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করছে। জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক বহুমুখী। কৃষি খাদ্য সরবরাহ করে শিল্প ও সেবা খাতের শ্রমশক্তিকে টিকিয়ে রাখছে।
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে শিল্পখাত মূল্য সংযোজন করে। কৃষকের আয় বৃদ্ধি পেলে গ্রামীণ ভোগব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। যা সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধি করে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখে। এককথায় কৃষি খাত অর্থনীতির ডিমান্ড-ড্রিভেন প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীল থাকলে খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকে। যা সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখে। পাট, আখ, চা, তুলা, ভুট্টা ইত্যাদি শিল্পখাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সরবরাহ করে। দেশের প্রধান রপ্তানি আয় আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তবে পাট, চা, হিমায়িত মাছ ও কিছু কৃষিপণ্যও রপ্তানিতে অবদান রাখছে।
বিশ্ববাজারে জৈব ও নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে। এটি আমাদের জন্য বড় সুযোগ। সঠিক মাননিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে কৃষিপণ্যের রপ্তানি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। সরকার দীর্ঘদিন ধরে কৃষি খাতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। সারের ভর্তুকি, বিদ্যুৎ ও ডিজেল চালিত সেচে ভর্তুকি। কৃষিযন্ত্রে প্রণোদনা কৃষি উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করছে। হাইব্রিড বীজ ও কৃষি উপকরণে সহায়তা আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক। কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষিঋণে সুদ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে কৃষি ভর্তুকির জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। যা কখনও কখনও ২০৩০ হাজার কোটি টাকার ঘরে পৌঁছায়।
এ সব ভর্তুকির দেওয়ার পেছনে কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো ও বাজারদর স্থিতিশীল রাখা। সারের ভর্তুকির কারণে কৃষক আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় অনেক কম দামে সার পান। যদি আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া বা ডিএপি সারের দাম বৃদ্ধি পায়। তাহলে সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখে। এতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং কৃষক চাষাবাদে উৎসাহিত হন। সেচে বিদ্যুৎ ও ডিজেল ভর্তুকি বোরো মৌসুমে উৎপাদন ধরে রাখতে সহায়ক হয়েছে। সেচ ব্যয় বেশি হলে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকত। কৃষিযন্ত্রে ৫০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়ায় যান্ত্রিকীকরণ দ্রুত বেড়েছে। হারভেস্টার ও রিপার ব্যবহারে শ্রমসংকট মোকাবিলা সম্ভব হয়েছে। তবে ভর্তুকি নিয়ে অর্থনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। বড় অঙ্কের ভর্তুকি বাজেটে চাপ সৃষ্টি করে। যদি রাজস্ব আদায় পর্যাপ্ত না হয়। তাহলে ঘাটতি অর্থায়নে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। সব কৃষক সমানভাবে ভর্তুকির সুবিধা পান না।
বড় কৃষক তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেয়ে থাকেন। ফলে প্রান্তিক কৃষক বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সারের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটির উর্বরতা কমাতে পারে এবং পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ভর্তুকি বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ভর্তুকি পুরোপুরি বাতিল করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি অকার্যকর ভর্তুকি অব্যাহত রাখাও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। সমাধান করতে হলে লক্ষ্যভিত্তিক ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। আজ কৃষি খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জমির পরিমাণ সীমিত এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নগরায়নের ফলে কৃষিজমি কমছে। খণ্ডিত জমি উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় এবং যান্ত্রিকীকরণে বাধা সৃষ্টি করে। জলবায়ু পরিবর্তন বড় ঝুঁকি। ঘন ঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও লবণাক্ততার বিস্তার উৎপাদনে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে ফসল বৈচিত্র্য সীমিত হয়ে পড়ছে। সংরক্ষণ সুবিধা কম থাকায় মৌসুমে দাম কমে যায়। কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়া একটি বড় সমস্যা। মৌসুমে উৎপাদন বেশি হলে দাম পড়ে যায়। আবার অফ-সিজনে দাম বেড়ে যায়। ফলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য এবং সংরক্ষণ সুবিধার অভাব বাজারব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে। আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির পর্যাপ্ত ব্যবহার এখনও সর্বত্র বিস্তৃত হয়নি। অনেক কৃষক এখনও প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করেন। সেজন্য উৎপাদনশীলতা সম্ভাব্য মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না। কাঁচা কৃষিপণ্য বিক্রি করে কৃষক সীমিত আয় পান। প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারণ না হলে উচ্চ আয় সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। একই জমি থেকে বেশি ফলন পেতে উন্নত বীজ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, আধুনিক সেচপদ্ধতি ও যান্ত্রিকীকরণ বাড়াতে হবে।
কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি ও সহজ ঋণপ্রাপ্তি কৃষকদের আধুনিকায়নে উৎসাহিত করতে পারে। ডিজিটাল কৃষি তথ্যসেবা- আবহাওয়া পূর্বাভাস, বাজারদর, রোগবালাই প্রতিরোধ কৃষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। কৃষি অর্থায়নও গুরুত্বপূর্ণ। প্রান্তিক কৃষকরা প্রায়ই প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পান না। ফলে উচ্চ সুদের অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। সহজ শর্তে কৃষিঋণ, ফসল বীমা এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকলে ঝুঁকি কমবে।
বিশেষ করে জলবায়ুজনিত ক্ষতির ক্ষেত্রে ফসল বীমা কৃষকদের সুরক্ষা দিতে পারে। ডিজিটাল কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে ভর্তুকি প্রদান করা যেতে পারে। এতে অপচয় কমবে। জলবায়ুজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় বীমা কার্যকর হতে পারে। কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারণ অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে। ধান থেকে চাল ছাড়াও ব্র্যান অয়েল, ভুট্টা থেকে পশুখাদ্য, ফল থেকে জুস ও জ্যাম। এভাবে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে কর্মসংস্থান বাড়বে। গ্রামীণ শিল্পাঞ্চল বা অ্যাগ্রো-প্রসেসিং জোন গড়ে তুললে কৃষি ও শিল্পের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
