কথা রাখল ইরান : হুঙ্কার ছাড়লেন খামেনির উত্তরসূরিরা

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইতিহাসের পাতায় যখন কাপুরুষতার কালো মেঘ জমে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের দিগন্তজুড়ে নতিস্বীকারের পরাধীন গ্লানি খেলা করে, তখন পারস্যের আকাশে উদিত হয় এক রক্তিম সূর্য। এটি শুধু একটি রাষ্ট্রের পাল্টা হামলা নয়, বরং কয়েক হাজার বছরের বীরত্বগাথা আর মাথানত না করার এক শাশ্বত অঙ্গীকারের পুনর্জাগরণ। ইরানের এই হুংকার যেন কবি নজরুলের সেই অমিয় বাণীকে স্মরণ করিয়ে দেয়- ‘বলো বীর, চির উন্নত মম শির!’ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে পারস্য কখনও কারও কাছে পদানত হয়নি, আজ খামিনির উত্তরসূরিরা তাদের সেই রক্তের উত্তরাধিকারকে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছে। যেখানে বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশ আজ আপসকামী নীতির কাছে নিজেদের বিবেককে বন্ধক রেখেছে, সেখানে ইরান একাই এক সিংহের মতো গর্জন করে দাঁড়িয়েছে। এটি শুধু সামরিক সক্ষমতার প্রকাশ নয়, এটি একটি আদর্শিক বিজয়ের মহাকাব্য, যা বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে দিয়েছে যে ছাগলের মতো হাজার বছর বেঁচে থাকার চেয়ে বাঘের মতো অল্প সময় বেঁচে থাকাও অনেক বেশি মর্যাদার।

পারস্যের এই বীরত্বগাথা আজ সেইসব মানুষদের মুখে চপেটাঘাত করেছে, যারা মনে করেছিল আকাশচুম্বী প্রযুক্তি আর পশ্চিমা দম্ভের সামনে সত্যের কণ্ঠরোধ করা সম্ভব। খামিনির উত্তরসূরীরা প্রমাণ করেছে যে, ঈমানি শক্তি আর দেশপ্রেমের কাছে আধুনিক সমরাস্ত্রও তুচ্ছ। রণতরীর পলায়ন থেকে শুরু করে ইসরায়েলের গর্তে লুকানো জনগণের আর্তনাদ- সবই আজ ইরানের সেই প্রতিশ্রুতির ফসল যা তারা আক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই দিয়েছিল।

ইরান শুধু একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, এটি একটি অবিনাশী চেতনা। খামিনির সুযোগ্য উত্তরসূরীরা যখন হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, প্রতিটি আঘাতের বদলা নেওয়া হবে- তারা সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ যখন পশ্চিমা শক্তির পদলেহনে ব্যস্ত, তখন পারস্যের এই সিংহরা দেখিয়ে দিয়েছে যে, বীরেরা কখনও পিছু হটে না। তাদের এই রণধ্বনি আজ বিশ্বব্যাপী নিন্দিত জালিমদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে এবং বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের মনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছে।

অ্যামেরিকা ও ইসরাইলের তথাকথিত অপরাজেয় স্থাপনাগুলো আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গণবর্ষণ প্রমাণ করেছে যে কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই অজেয় নয়। যখন লোহিত সাগরে মার্কিন রণতরীগুলো ইরানের ভয়ে পলায়ন করে, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সমুদ্রের ওপর খবরদারি করার দিন শেষ হয়ে এসেছে। এটি ছিল সেই প্রতিশ্রুত পাল্টাব্যবস্থা যা খামিনির উত্তরসূরীরা বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল।

ইরানের সামরিক কৌশলের অভাবনীয় প্রয়োগ ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে পর্যন্ত ভাবিয়ে তুলেছে। তাদের ক্লাস্টার বোমা ও অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের সক্ষমতা দেখে আজ পশ্চিমা বিশ্ব স্তম্ভিত। ফররুখজাদের দেশের এই আধুনিক যোদ্ধারা প্রমাণ করেছে যে প্রযুক্তির লড়াইয়ে তারা এখন কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই। ইউরোপের নেতারা এখন ভয়ে সিঁটিয়ে আছেন, কারণ তারা জানেন যে পারস্যের এই সিংহরা জাগলে পুরো মহাদেশের মানচিত্র বদলে যেতে পারে।

আমেরিকার বিশাল সেনাবাহিনী যারা বিভিন্ন দেশে আধিপত্য বিস্তার করতে অভ্যস্ত, তারা আজ স্থল যুদ্ধের কথা শুনলে পিছু হটছে। ইরানের দুর্ধর্ষ কমান্ডো ও বিপ্লবী গার্ডদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস এখন আর কারও নেই। এটি যেন সেই কবিতারই প্রতিফলন- ‘আমরা বীরের জাতি, মোদের দেখে শত্রু ডরে।’ স্থলপথে ইরানের আধিপত্য আজ এক ধ্রুব সত্য, যা পশ্চিমারা মানতে বাধ্য হচ্ছে।

ইরানের সামরিক দর্শন এখন আর শুধু রক্ষণাত্মক নয়, বরং তা প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক। হামলার পর মুহূর্তের মধ্যেই যেভাবে পাল্টা আঘাত হানা হয়েছে, তা সামরিক বিশেষজ্ঞদের গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো দীর্ঘসূত্রিতা নয়, বরং চোখের পলকে শত্রুর দুর্গ গুঁড়িয়ে দেওয়ার এই নীতি খামেনির উত্তরসূরীদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেয়। বিশ্বের অর্থনীতির নাভিমূল খ্যাত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার যে হুমকি ইরান দিয়েছিল, তা আজ বাস্তব হতে চলেছে। এই প্রণালীর চাবিকাঠি এখন খামেনির উত্তরসূরীদের হাতে। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে যে যদি ইরানকে অবরুদ্ধ করা হয়, তবে সারা বিশ্ব অন্ধকারে ডুবে যাবে। এই সাহসিকতা শুধু পারস্যের সন্তানদের পক্ষেই দেখানো সম্ভব। আজ ইসরায়েলি বন্দরগুলোতে পণ্যবাহী জাহাজের বদলে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যাচ্ছে। ইরানের নিখুঁত নিশানায় ইসরায়েলের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে। হাইফা ও আশদোদ বন্দরের ধ্বংসাবশেষ আজ ইরানের দেওয়া প্রতিশ্রুতির নীরব সাক্ষী। শত্রুর দম্ভকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার এই দৃশ্য আজ মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি বিদ্রোহী হৃদয়ে প্রশান্তি বয়ে আনছে।

একসময় যারা ফিলিস্তিনিদের ওপর আকাশ থেকে মৃত্যুবর্ষণ করত, আজ ইরানের ড্রোনের ভয়ে সেই ইসরায়েলি জনগণ ইঁদুরের মতো গর্তে আর বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকছে। খামেনির উত্তরসূরীরা ইসরায়েলের আকাশকে এমন এক আতঙ্কে পরিণত করেছে যে, সাইরেনের শব্দই এখন তাদের জাতীয় সংগীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটিই হলো প্রকৃত ইনসাফ, যা যুদ্ধের ময়দানে ইরান প্রতিষ্ঠা করেছে।

ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি আজ বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার এই সক্ষমতা প্রমাণ করে যে তারা প্রযুক্তিতে বিস্ময়কর উন্নয়ন ঘটিয়েছে। পারস্যের এই আকাশচারী শিকারিরা আজ শত্রুর প্রতিটি রাডারকে ফাঁকি দিয়ে তাদের আস্তানায় আঘাত হানছে, যা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়।

ইরানের এই বিশাল শক্তির মহড়া দেখে শুধু সরাসরি শত্রুরাই নয়, বরং শত্রুদের দোসর প্রতিবেশী দেশগুলোও ভয়ে কাঁপছে। যারা পর্দার আড়ালে বসে পশ্চিমাদের মদদ দিচ্ছিল, তারা এখন বুঝতে পারছে যে সিংহের সঙ্গে শত্রুতা করার পরিণাম কী হতে পারে। শত্রুর সকল সহযোগীদের ওপর আঘাত হেনে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে, যে গাদ্দারদের কোনো ক্ষমা নেই। পুরো আরব বিশ্বের নীরবতা এবং পশ্চিমা বিশ্বের সম্মিলিত আক্রমণের বিরুদ্ধে ইরান আজ একাই লড়ছে।

এই একাকী লড়াই তাদের মর্যাদা কমিয়ে দেয়নি, বরং বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কবির ভাষায়- ‘একলা চলো রে’ - নীতিতে বিশ্বাসী এই জাতি প্রমাণ করেছে যে সত্যের পথে থাকলে সংখ্যা কোনো বিষয় নয়। একাই তারা আজ পুরো বিশ্বের জুলুমের বিরুদ্ধে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। আয়ন আল আসাদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গোপন আস্তানা আজ ধ্বংসস্তূপ। ইরানের এই বীরত্ব প্রমাণ করেছে যে, মার্কিনীরা এই অঞ্চলে আর নিরাপদ নয়। তাদের দম্ভের প্রতিটি ইট আজ খামেনির উত্তরসূরীরা খসিয়ে দিচ্ছে।

শত্রুরা যখন ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার দুঃস্বপ্ন দেখছে, তখন ইরান তাদের নিজেদের স্থাপনাগুলোকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার রণকৌশল চূড়ান্ত করেছে। পারস্যের বিজ্ঞানীরা শুধু গবেষণাগারে নয়, যুদ্ধের ময়দানেও তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। তাদের এই মেধা ও বীরত্বের সংমিশ্রণ ইরানকে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল সমুদ্রে মার্কিন আধিপত্যের প্রতীক জাহাজগুলো আজ ইরানের লক্ষ্যবস্তু। পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি আজ মার্কিন রক্তে রঞ্জিত হওয়ার অপেক্ষায়। ইরান প্রমাণ করেছে যে সমুদ্রের ওপর তাদের অধিকার অবিভাজ্য এবং কোনো বিদেশি শক্তি এখানে দাদাগিরি করতে পারবে না।

যখন একসঙ্গে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের অভিমুখে ধেয়ে যায়, তখন মনে হয় যেন আসমান থেকে খোদায়ী গজব নাজিল হচ্ছে। এই গণবর্ষণ ছিল ইরানের সেই অঙ্গীকারের অংশ যেখানে তারা বলেছিল যে শত্রুকে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। এই আগুনের বৃষ্টিতে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে অন্যায় আর অবিচারের রাজত্ব।

ইরানের সাইবার হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আজ ইসরায়েলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। পুরো একটি দেশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়া তাদের প্রযুক্তির চরম পরাজয়কে তুলে ধরে। বিপরীতে, ইরানের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আজ বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে, যা তারা অতি অল্প সময়ে নিজস্ব মেধায় গড়ে তুলেছে।

লেবানন থেকে ইয়েমেন, ইরাক থেকে সিরিয়া-ইরানের আদর্শে উজ্জীবিত প্রক্সি গ্রুপগুলো আজ এক শক্তিশালী প্রতিরোধ বলয় তৈরি করেছে। এটি শুধু ইরানের যুদ্ধ নয়, এটি পুরো মজলুম জনপদের যুদ্ধ। খামেনির উত্তরসূরীরা এই প্রক্সি গ্রুপগুলোকে এমনভাবে সংগঠিত করেছে যে শত্রুরা এখন চারদিক থেকে আক্রান্ত।

শুধু সামরিক নয়, শত্রুর অবকাঠামো ও অর্থনীতির ওপর ইরান যে কৌশলী আঘাত হেনেছে, তা তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরাজয় নিশ্চিত করেছে। গ্যাসলাইন থেকে শুরু করে শিল্প এলাকা- সবই আজ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায়। শত্রুকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার এই রণকৌশল অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

হাজার বছরের ইতিহাসে পারস্য কখনও মাথানত করেনি। আজ গ্রীক, রোমান কিংবা মঙ্গোলদের মতো পশ্চিমারাও বুঝতে পারছে যে এই সিংহের জাতিকে পদানত করা অসম্ভব। খামিনির উত্তরসূরীরা সেই শিকড় থেকে শক্তি সংগ্রহ করেছে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের দিয়েছিল বীরত্বের খেতাব। এই সিংহের জাতি এখন বিজয়ের চূড়ান্ত সোপানে পা রাখছে।

ইরানের এই বীরত্বপূর্ণ পাল্টা ব্যবস্থা শুধু একটি সামরিক বিজয় নয়, এটি আত্মমর্যাদার এক নতুন সংজ্ঞা। যখন মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ নেতা নিজেদের প্রাসাদে বসে নীরব দর্শক, তখন ইরানের এই সাহসী পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে সত্য ও ন্যায়ের জন্য লড়াই করার সাহস এখনও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। কবি নজরুলের ভাষায়, ‘মহাবিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত’ ইরানের এই বিপ্লব ততক্ষণ থামবে না, যতক্ষণ না এই অঞ্চল থেকে জুলুমের শেষ চিহ্ন মুছে যায়। খামেনির উত্তরসূরীরা তাদের কথা রেখেছে, তারা শত্রুর বুকে ভয়ের কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে এবং বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে যে সিংহের মতো বেঁচে থাকাই জীবনের আসল সার্থকতা। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে ইরান আজ একাই এক অপরাজেয় আলোকবর্তিকা, যা সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল