দক্ষিণ এশিয়ায় জেন-জি আন্দোলনের ভিন্ন বাস্তবতা
মো. আজহারুল ইসলাম আকাশ
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তন যেন একেকটি ঝড়ের মতো। ঝড় এসে পুরোনো গাছ উপড়ে ফেলতে পারে, কিন্তু নতুন বন গড়ে ওঠে কি না তা নির্ভর করে সেই ঝড়ের পরে বীজ বপনের ওপর। দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক জেনারেশন-জি বা তরুণদের আন্দোলনগুলোও ঠিক তেমনই। এই আন্দোলনগুলো ক্ষমতার কাঠামোকে কাঁপিয়ে দিয়েছে, সরকার পতন ঘটিয়েছে, কিন্তু সেই শক্তি নির্বাচনের মাঠে কতটা স্থায়ী রূপ নিতে পেরেছে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
দক্ষিণ এশিয়ায় জেনারেশন-জি (জেন-জি) বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনগুলো সরকার পতন ঘটিয়েছে, কিন্তু নির্বাচনি সাফল্যে তাদের প্রভাব ভিন্ন। নেপালে সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে জেন-জি সমর্থিত নতুন দল রাস্ত্রিয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) ভূমিধস জয় লাভ করে সরকার গঠনের পথে, যেখানে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় আন্দোলন পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর পুনরুত্থানে সাহায্য করেছে। নেপালের সাফল্যের পিছনে আন্দোলনের সরাসরি রাজনৈতিক সংগঠন গঠন, যেখানে অন্য দুটি দেশে সেনাবাহিনী ও প্রতিষ্ঠিত প্যাট্রনেজ নেটওয়ার্কের ভূমিকা আন্দোলনকারীদের ছায়ায় ফেলেছে।
নেপালে গত সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ জেন-জি আন্দোলন দুর্নীতি, নিয়োগপত্রবাদ (নেপোটিজম) ও সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে শুরু হয়ে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকার পতন ঘটায়। ৭৭ জনেরও বেশি প্রতিবাদকারী নিহত হয়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় এবং ৫ মার্চ ২০২৬-এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক ফলাফলে, প্রাক্তন র্যাপার ও কাঠমান্ডু মেয়র বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন আরএসপি ১৬৫টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের মধ্যে ১১০টিরও বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা (১৩৮ আসন) অতিক্রম করার ইঙ্গিত।
বালেন্দ্র শাহ নিজে ওলির নির্বাচনি এলাকা ঝাপা-৫ এ বিপুল লিড নিয়ে এগিয়ে। পুরোনো দলগুলো যেমন নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন-ইউএমএল মাত্র ১০-১৫ আসনে সীমাবদ্ধ। এটি জেন-জির প্রথম সরাসরি রাজনৈতিক জয়, কারণ আরএসপি ২০২২-এ গঠিত নতুন দল এবং আন্দোলন থেকে উঠে আসা তরুণ নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে ২০২৪-এর জেন-জি আন্দোলন শেখ হাসিনার ১৭ বছরের কর্তৃত্ববাদী সরকার পতন ঘটায়, যাতে ১,৪০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্বাচন হয়।
এতে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) ২০৯-২১২ আসন নিয়ে ভূমিধস জয়ী হয়, যা দলটির ২০ বছর পর ক্ষমতায় ফেরা। কিন্তু আন্দোলন থেকে উঠে আসা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) মাত্র ৬ আসন পায়। জামায়াত-ই-ইসলামী-সমর্থিত জোট ৬৮-৭৭ আসন পেলেও, জেন-জি নেতৃত্বের সরাসরি প্রভাব কম। বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং বিএনপির পুরনো প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট নেটওয়ার্ক আন্দোলনের শক্তিকে পুরনো দলের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। শ্রীলঙ্কায় ২০২২-এর আরাগালায়া (সংগ্রাম) আন্দোলন অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু হয়ে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসেকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর ২০২৪-এর নির্বাচনে ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) দু-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয় এবং অনুরা কুমারা দিসানায়েকে প্রেসিডেন্ট হন। এনপিপি বামপন্থী জোট, যা ২০১৯-এ গঠিত এবং আন্দোলনে অংশ নেয়। কিন্তু এটি সরাসরি জেন-জি দল নয় বরং প্রতিষ্ঠিত ইউনিয়ন ও রাজনৈতিক গ্রুপের সংমিশ্রণ। আন্দোলন এনপিপিকে শক্তি জোগায়, কিন্তু তরুণদের নতুন দল গঠনের সুযোগ কম থাকে।
নেপালের জেন-জি আন্দোলন পুরো রাজনৈতিক সিস্টেমের বিরুদ্ধে ছিল, যা নতুন দল যেমন আরএসপি গঠন ও তরুণ প্রার্থীদের উত্থান ঘটায়। ৫২% ভোটার ১৮-৪০ বছরের, যারা পুরনো দলের বিকল্প চায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর অন্তর্বর্তীকালীন ভূমিকা ও বিএনপির নেটওয়ার্ক জেন-জির এনসিপিকে ছোট করে রাখে। শ্রীলঙ্কায় আরাগালায়া প্রতিষ্ঠিত এনপিপিকে সাহায্য করে, কিন্তু জেন-জি সরাসরি নতুন শক্তি গঠন করতে পারেনি।
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখলে একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যায় যুবসমাজ আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, কিন্তু নির্বাচনের ময়দানে সেই শক্তিকে টেকসই রূপ দেওয়া সবসময় সহজ নয়। নেপালের উদাহরণ দেখায়, যখন আন্দোলনকারীরা সংগঠিত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে, তখন সেই শক্তি নির্বাচনি সাফল্যেও রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা দেখায়, পুরনো রাজনৈতিক কাঠামো ও নেটওয়ার্ক অনেক সময় আন্দোলনের শক্তিকে নিজেদের দিকে টেনে নিতে সক্ষম হয়।
এই ভিন্ন বাস্তবতার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিক সংগঠন গঠনের সক্ষমতা।
নেপালে আন্দোলনের মধ্য থেকেই একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে, যা নির্বাচনে সরাসরি অংশ নেয়। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভূমিকা। বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর অন্তর্বর্তীকালীন প্রভাব এবং পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তিশালী নেটওয়ার্ক নতুন শক্তির উত্থানকে সীমিত করে দেয়। তৃতীয়ত, ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। শ্রীলঙ্কায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দল ও ইউনিয়নভিত্তিক কাঠামো নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে দ্রুত প্রতিষ্ঠা পেতে বাধা সৃষ্টি করে।
এই বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আন্দোলনের শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তর করা।
শুধু রাস্তায় প্রতিবাদ নয়, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অংশগ্রহণের জন্য শক্তিশালী সংগঠন, দক্ষ নেতৃত্ব এবং সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করাও জরুরি।
সব দেশেই অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি ও যুবকদের চাকরির অভাব সাধারণ, কিন্তু নেপালে সোশ্যাল মিডিয়া-চালিত আন্দোলন সরাসরি নির্বাচনি পরিবর্তনে রূপান্তরিত হয়েছে। এই তিন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, জেন-জি আন্দোলন সরকার পতন ঘটাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে রাজনৈতিক সংগঠন গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের উপর।
নেপালের জয় অন্যান্য দেশের যুবকদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার মতো পুরনো শক্তির ফেরত আসা সতর্কতার সংকেত। তরুণদের আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে তারা পরিবর্তনের শক্তি রাখে। কিন্তু সেই পরিবর্তনকে স্থায়ী করতে হলে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন সংগঠন, কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনা।
মো. আজহারুল ইসলাম আকাশ
শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
