জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় : শিক্ষাসংকট ও উত্তরণের পথ
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল, শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বিস্তৃত পরিসরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এক অনন্য পাবলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থী সংখ্যার দিক থেকে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের উপকণ্ঠ- সবখানেই এর অধিভুক্ত কলেজগুলো উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্স ও ডিগ্রি- দুটি পৃথক বিভাগে কোর্স পরিচালিত হয়। প্রায় ২২৫৭টি কলেজ এর অধিভুক্ত এবং অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৪ লাখ ২৫ হাজার ৮৩২ জন। দেশের উচ্চশিক্ষা গ্রহণেচ্ছু শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭০ শতাংশ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে পড়াশোনা করেন- যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এর অপরিহার্য ভূমিকার প্রমাণ বহন করে।
এত বড় পরিসরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী সফল হচ্ছেন এবং সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অনেক শিক্ষার্থী বিদেশেও উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ অর্জন করছেন। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে- সুযোগ ও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এই বিশাল শিক্ষার্থীসমাজ দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পর বহুল আলোচিত সেশনজট ধীরে ধীরে কমছে এবং ফল প্রকাশেও কিছুটা গতিময়তা এসেছে- যা একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ কোর্সে সেশনজট রয়ে গেছে, ফলে শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় ধরে পড়াশোনা করতে হয়। এটি তাদের কর্মজীবনে প্রবেশেও বিলম্ব ঘটায়- যা উচ্চশিক্ষার কাঙ্ক্ষিত ফলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা নানা কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার মুখোমুখি। প্রথমত, অবকাঠামোগত সমস্যা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অধিকাংশ অধিভুক্ত কলেজে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, আধুনিক ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও ডিজিটাল শিক্ষার পরিবেশ নেই। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে শিক্ষা সুবিধা বাড়েনি। অনেক জায়গায় গাদাগাদি করে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে হয়- যেখানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার যুগে স্মার্ট ক্লাসরুম, ই–লার্নিং ও আধুনিক ল্যাব ছাড়া শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। এর পরেই আসে শিক্ষক সংকট। ইউজিসি প্রকাশিত ৫০তম বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত প্রায় ১:৩৩- অর্থাৎ একজন শিক্ষককে গড়ে ৩৩ জন শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিতে হয়। বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই আরও করুণ। অনেক কলেজে একই শিক্ষককে উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে পাঠদান করতে হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না এবং শিক্ষার মানও প্রভাবিত হয়।
এছাড়া শিক্ষার মানের সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ের চিত্র উদ্বেগজনক। ইউজিসি প্রকাশিত প্রতিবেদনে হতে দেখা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় মাত্র ৭৯৫ টাকা ৫৫ পয়সা- যা সর্বনিম্ন।
এত বিশাল শিক্ষার্থীসংখ্যার তুলনায় এই ব্যয় অত্যন্ত নগণ্য। উল্লেখ্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে পর্যাপ্ত পরিচালন বাজেট না পাওয়ায় অধিভুক্ত কলেজগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ফি থেকেই ব্যয় নির্বাহ করতে হয়। ফলে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগও ওঠে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা গ্রহণকে কঠিন করে তোলে। কারণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অনেককে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের ভরণপোষণের জন্য চাকরি করতে হয়। এতে অনেকে নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিতে পারে না- যা শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে। আরও একটি কাঠামোগত সমস্যা হলো অধিভুক্ত কলেজগুলোতে একসঙ্গে একাধিক স্তরের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। একই কলেজে উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স চালু থাকার কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শ্রেণির পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তখন অন্যান্য শ্রেণির ক্লাস কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বছরের উল্লেখযোগ্য সময় ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পাঠদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। বাস্তবে দেখা যায়, বছরের অধিকাংশ সময়ই বিভিন্ন কোর্সের পরীক্ষা ও ইনকোর্স পরীক্ষার কারণে ক্লাস কার্যক্রম ব্যাহত থাকে- যা শিক্ষাজীবনকে অনিয়মিত করে তোলে।
এছাড়া পরীক্ষা মূল্যায়ন নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। পরীক্ষা মূল্যায়নে অনিয়ম হয়- ভালো পরীক্ষা দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। ফলাফল রিচেক করালে অনেক ক্ষেত্রে ফল পরিবর্তন হয়। এই পরিস্থিতি মূল্যায়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। গবেষণার ক্ষেত্রেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সময়ের তুলনায় পিছিয়ে আছে। ইউজিসির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে গবেষণা অনুদান ছিল প্রায় ৫.০২ কোটি টাকা, অথচ ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫৮ লখ টাকা। এত বিশাল শিক্ষার্থীসংখ্যার বিপরীতে নেই ভালো কোনো গবেষণা কেন্দ্র, নেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণা সচেতনতা- যা উচ্চশিক্ষার জ্ঞানভিত্তিক অগ্রগতিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
এসব সমস্যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়ে চাকরির বাজারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইওউঝ পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ স্নাতক আংশিক বেকারত্বে রয়েছেন। অনেক শিক্ষার্থীর আইসিটি দক্ষতা, বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে- ফলে চাকরির প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়েন। চাকরি শুধু ডিগ্রির ওপর নির্ভর করে না; দক্ষতা, নেটওয়ার্কিং ও বাস্তব অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।
এই সংকট উত্তরণে বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন। প্রথমত, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, ডিজিটাল লাইব্রেরি ও ল্যাব সুবিধা বাড়ানো জরুরি। দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পাঠদান পায়। তৃতীয়ত, পাঠ্যক্রম সংস্কার করে আইসিটি দক্ষতা, সফট স্কিল ও কর্মমুখী শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন- যাতে শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে। বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু করা গেলে তারা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে। কর্মজীবী শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় আংশিক অনলাইন ক্লাস, রেকর্ডেড লেকচার ও রাত্রিকালীন ক্লাস ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে- এতে চাকরি ও পড়াশোনার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষা মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করা জরুরি- যাতে মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগ কমে। গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি করতে হবে, গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে হবে। শিল্পখাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা বাড়ালে শিক্ষার্থীরা কর্মমুখী প্রশিক্ষণ ও চাকরির সুযোগ পাবে।
পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি নেটওয়ার্কিং তৈরী করা সময়ের দাবি। একটি শক্তিশালী শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলে চাকরির তথ্য বিনিময়, দক্ষতা উন্নয়ন, ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং ক্যারিয়ার নির্দেশনা পাওয়া সহজ হবে। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলবে এবং পেশাগত সুযোগ বৃদ্ধি করবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে- যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
