গ্রুপিংয়ের বেড়াজালে মেধার মৃত্যু : বিশ্ববিদ্যালয় কি তার পরিচয় হারাচ্ছে

মোজাহিদ হোসেন, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের চেয়ারম্যান আসমা সাদিয়া রুনাকে নিজের অফিস রুমে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। সেই হত্যা করল একজন সাধারণ কর্মচারী ফজলুর রহমান। যে স্থায়ী বেতনভুক্ত কর্মচারীও নন। ডে লেবারের একজন কর্মচারী। সে হত্যা করে নিজেই আত্মহননের চেষ্টা করেছে, যদিও বেঁচে আছে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন একটাই- একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসে যদি শিক্ষককে হত্যা করা হয়, তাহলে শিক্ষকদের নিরাপত্তা কোথায়? আর কে দিবে এই নিরাপত্তা। খবরের মাধ্যমে জানা গেছে ওনার শরীরের ২০ জায়গায় আঘাতের চিহ্ন। কতো নিষ্ঠুর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে! ভাবতেও শরীর শিহরিত হয়ে যায়। কিন্তু এটাই আজ দেশের বাস্তব চিত্র।

বিশ্ববিদ্যালয়, যে জায়গায় বিশ্ব মানের পড়াশোনা হওয়ার কথা সে জায়গায় হচ্ছে বিশ্ব মানের ক্রাইম। যেখানে হওয়ার কথা শিক্ষার প্রতিযোগিতা, সেখানে হচ্ছে ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারের প্রতিযোগিতা। বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্বতা দিনের পর দিন হারিয়ে ফেলেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী রাজনীতির জন্য ক্যাম্পাসগুলোতে জটিলতা বেড়েই চলেছে। করে তুলেছে অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতির আখড়া- চারদিকে স্বার্থান্ধ মানুষের সয়লাব।

গত বছরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আল কোরআন বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহর লাশ পুকুরে পাওয়া যায়। কিভাবে হত্যা হলো! কে বা কারা হত্যা করল, এখনও তার প্রকৃত হদিস মেলেনি। প্রশাসন আশার বাণী শুনালেও কোনো আশার আলো জাগাতে পারেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুদণ্ড হলো প্রশাসন। কিন্তু বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন হয়ে উঠেছে রাজনীতির মঞ্চ। কর্মকর্তা- কর্মচারীদের বিভক্তি। শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তি এবং গ্রুপিং। যার ফলাফল রুনা ম্যামের মতো শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষকের জীবন। ম্যামের মৃত্যুর পরে উঠে এসেছে তিনি বিভাগের সভাপতি হওয়ার পর অন্য শিক্ষকদের অসহযোগিতা। সেখানে অন্য গ্রুপিং। এছাড়া বিভাগগুলো সেশনজট, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিরূপ সম্পর্ক, ইত্যাদি। কিন্তু এভাবে আর কতদূর!

একজন শিক্ষক যদি নিজ কক্ষে নিরাপত্তা না পায় তাহলে সেই শিক্ষক কীভাবে এবং কেন ক্যাম্পাসে আসবে? বাড়ি থেকে একজন শিক্ষার্থী যদি পড়াশোনা করতে এসে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরে তাহলে কেন পড়াশোনা করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে? আজ আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছি। কথা বলার মতো ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। কথা বলার মতো জায়গা নেই। এসবের জন্য বারবার শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিল ছেড়ে রাজপথে নামতে হয়। শুধু মাত্র শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের জন্য। ক্যাম্পাসে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য। তারপরও প্রশাসন নিশ্চুপ।

এ সমস্ত কিছুর অন্যতম কারণ হিসেবে বলা যায় শিক্ষকদের রাজনৈতিক গ্রুপিং এবং নিয়োগ বাণিজ্য। দেশের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালেই তার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে কর্মচারী কর্মকর্তারা নিয়োগ বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় পাওয়ার বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়োগ হয়ে আসছে যুগের পর যুগ। কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেশির ভাগই বুঝে না- বিশ্ববিদ্যালয় কী! বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কারা! বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কারা! কেননা তাদের সেই বুঝার সক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না। তার বাস্তব প্রমাণ সাদিয়া রুনা ম্যামের হত্যাকাণ্ড। যেই কর্মচারী হত্যা করেছে তাকে অন্য বিভাগে বদলি দেওয়া হয়েছে আচরণ ভঙ্গের কারণে। বিভাগের শিক্ষার্থীদের মতে, সে উনাকে সম্মান তো দূরের কথা, কোনো রকম মূল্যায়নই করতো না। এই জায়গায় আজ প্রশ্ন! এরকম একজন ব্যক্তিকে বিভাগ কোনো যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছে? রুনা ম্যামের চারজন ছোট বাচ্চা। তারা পৃথিবীর কোনো কিছু বুঝে উঠতে না পেরেই মাতৃহীন হয়ে গেল। এর দ্বায়ভার কে নিবে? এক বাচ্চা মানববন্ধনে সাংবাদিকদের বলেছিল, আমাদের ঘুম না, ছোট ভাই বোনরা সারারাত ঘুমায় না, মা আমাদের কতো আদর করে ঘুমাই দিতো! তার এইসব কথার জবাব কে দিবে আজ! আর কী বা জবাব হবে!

এছাড়া দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অসংখ্য যৌন হয়রানি অভিযোগ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগ কারা করে? বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরাই। তাহলে এই ধরনের অযোগ্য ব্যক্তিরা কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়! ঘটনা বড় হলে কিছু দিন দেখা যায় কিছু শিক্ষক বহিষ্কার হয়। আবার অনেকে বহাল তবিয়তে থেকে যায় অদৃশ্য ক্ষমতা বলে। আবার নিজেদের কুকর্ম শুরু করে। বাইরে থেকে পড়াশোনা করতে আসা শিক্ষার্থীরা নিরুপায়! অসহায়!

যোগ্য ব্যক্তিরা যোগ্য জায়গায় আসলে কখনই এরকম ঘটনা ঘটার সুযোগ হতো না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যোগ্য ব্যক্তিদের যোগ্য জায়গায় নিয়ে আসবে কে? গ্রামে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, যে সরিষা দিয়ে ভূত তাড়াবে, সেই সরিষাতেই ভূত, তাহলে কী ভূত পালাবে! এটাই আজকের বাস্তবতার চূড়ান্ত রূপ। কথা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কাছে আলোর জ্যোতি ছড়াবেন। সেই জ্যোতিতে আলোকিত হবে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষিত হবে এই সমাজ, শিক্ষিত হবে এই জাতি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য আজ। এর পুরোপুরি উল্টো চিত্র। শিক্ষার্থীরা অধিকাংশ শিক্ষকের ক্লাস করতে চায় না। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মন বসে না। এর কারণ শিক্ষকদের পাঠদানে অযোগ্যতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির উপর নম্বর না থাকলে হয়তো ক্লাস রুমগুলো ফাঁকায় পরে থাকতো দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অন্য বড় সমস্যা স্থানীয়ের দৌরাত্ম্য। এরা সময় অসময়ে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। উগ্র মনোভাব নিয়ে চলাচল করে। কিন্তু প্রশাসন কোনোরকম উদ্যোগ গ্রহণ করে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাদকের ছড়াছড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে মাদক সহজলভ্য হয়ে গেছে। কথা ছিল মাদকের ধারের কাছে যাওয়ারও সুযোগ নাই। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মানুষের যে ধারণা, তা আজ নেই। এখন বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ধারণা যে, দেশের নোংরা রাজনীতির উপযুক্ত জায়গা। যেখানে অন্যায় অবিচার, দুর্নীতি, অনিয়ম সবকিছুই হয়, শুধু হয় না জ্ঞানচর্চা, হয় না গবেষণা।