জ্বালানি নিরাপত্তায় অবহেলা

মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জবাবদিহি জরুরি

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। অথচ সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের মজুত সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। গত রোববার এক খবরে প্রকাশ, যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ৭৪ দিন, ভিয়েতনামে ৪৫ দিন কিংবা জাপানে ২৫০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকে, সেখানে বাংলাদেশে এই মজুত মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিনের, যা শুধু দৈনন্দিন পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হয়। আপৎকালীন সুরক্ষা হিসাবে একে কোনোভাবেই বিবেচনা করা যায় না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২০ সালে করোনা মহামারিকালীন যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম তলানিতে নেমেছিল, তখন তৎকালীন সরকার তেলের মজুত সক্ষমতা ৬০ দিনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বিগত ছয় বছরেও সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিপিসি বা বিতরণ কোম্পানিগুলোর কোনো কার্যকর আগ্রহ দেখা যায়নি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং এর অধীনস্থ তিন বিতরণ কোম্পানি-পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার অদক্ষতা, অদূরদর্শিতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতায় দেশ আজ সংকটের মুখে।

বিগত সরকার বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের নামে রেন্টাল বা কুইক রেন্টালের মতো ব্যয়বহুল ও অনেক ক্ষেত্রে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলেও, জ্বালানি তেলের দীর্ঘমেয়াদি মজুত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে তাদের রহস্যজনক উদাসীনতা আজ দেশবাসীকে ভোগান্তিতে ফেলেছে। একদিকে যেমন অবকাঠামো উন্নয়নে অবহেলা করা হয়েছে, অন্যদিকে সক্ষমতা বৃদ্ধির চেয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতাকেই প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে হাজার হাজার কোটি টাকার অলস অর্থ থাকলেও তারা তা সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ না করে ব্যাংকে রেখে সুদ গ্রহণেই বেশি উৎসাহী। বিস্ময়কর তথ্য হলো, গত অর্থবছরে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের একেকজন কর্মচারী ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশের বোনাস পেয়েছেন। অথচ দেশে জ্বালানি তেলের হাহাকার চলছে, রেশনিংয়ের কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে এবং যুদ্ধের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ এখন দিশাহারা। প্রতিষ্ঠানের এই বিলাসিতা আর জাতির জ্বালানি নিরাপত্তার দৈন্যদশা-একই মুদ্রার দুই পিঠ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে।

বলা বাহুল্য, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা শুরু হওয়ার পরও বিপিসি যে কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি, তা তাদের পেশাদারত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এমনকি যুদ্ধের শুরুতে তেলের যৌক্তিক বণ্টনের পরিবর্তে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ তেল বিক্রি করে মজুতকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশে কমপক্ষে ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকা অপরিহার্য। আমরা মনে করি, বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শুধু দুই-একজন কর্মকর্তাকে ওএসডি করা বা সাময়িক রদবদল কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং জ্বালানি খাতের এই রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া অদক্ষতা ও দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। বিপিসি এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর অলস অর্থ অবিলম্বে মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যয় করাও বাধ্যতামূলক করতে হবে। একইসঙ্গে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের (এসপিএম) মতো অলস পড়ে থাকা প্রকল্পগুলো দ্রুত সচল করে জ্বালানি নিরাপত্তাকে দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অদূরদর্শিতার খেসারত যেন সাধারণ জনগণ ও জাতীয় অর্থনীতিকে দিতে না হয়, সে বিষয়ে সরকার কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।