একই ঈদ, ভিন্ন জীবন
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। আনন্দ, ভালোবাসা ও ভাগাভাগির এই উৎসব ঘিরে মানুষের থাকে নানা প্রত্যাশা ও প্রস্তুতি। রমজানের এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ আসে এক অনাবিল আনন্দের বার্তা নিয়ে। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- ঈদের আনন্দ সবার জীবনে একইভাবে ধরা দেয় না। সমাজের ধনী, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে ঈদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন ভিন্ন রঙে ফুটে ওঠে। তাই ঈদ এলেই যেন সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমাদের সমাজে ঈদ মানেই নতুন পোশাক, বিশেষ খাবার আর নানা আয়োজন।
ছোটবেলা থেকেই আমরা শুনে আসছি- ঈদের দিনে নতুন জামা পরতে হয়। তাই ঈদকে ঘিরে নতুন পোশাক কেনা যেন একটি সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। অনেক পরিবারে দেখা যায়, পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তি সীমিত আয়ের মধ্যেও সবার জন্য কিছু না কিছু কেনার চেষ্টা করেন। হয়তো একজন বাবা বা বড় ভাই নিজের প্রয়োজনকে পেছনে রেখে পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনে দেন।
অনেক সময় নিজের জন্য কিছু কেনার সুযোগ আর থাকে না। তবুও পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি দেখলেই তার মনে এক ধরনের তৃপ্তি জন্ম নেয়। অল্প আয়ের সংসারেও এই ত্যাগ, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসার গল্পই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলে। অন্যদিকে শহরের বড় বড় শপিং মল কিংবা নামি ফ্যাশন হাউজগুলোতে ঈদের আগে এক ভিন্ন চিত্র দেখা যায়।
সেখানে ক্রেতাদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকে না। নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও নানা ধরনের সামগ্রী সাজিয়ে রাখা হয় আকর্ষণীয়ভাবে। অনেকেই সেখানে একসঙ্গে হাজার হাজার এমনকি লাখ টাকা খরচ করে কেনাকাটা করেন। দামি ব্র্যান্ডের পোশাক, ফ্যাশনেবল জুতা কিংবা আধুনিক প্রসাধনী সবকিছুই যেন ঈদের প্রস্তুতির অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত কিছু কেনাকাটা করার পরও অনেক সময় মানুষের মধ্যে পূর্ণ তৃপ্তি দেখা যায় না। যেন আনন্দের সেই অনুভূতিটা কোথাও অপূর্ণ থেকে যায়। মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষদের ঈদের প্রস্তুতি একটু ভিন্ন ধরনের। তারা সাধারণত হিসাব করে কেনাকাটা করেন।
মাসিক আয়-ব্যয়ের সঙ্গে মিল রেখে তারা ঈদের বাজেট নির্ধারণ করেন। সেই বাজেটের মধ্যেই পরিবারের সবার জন্য পোশাক কেনা, ঈদের খাবারের আয়োজন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন। অনেক সময় নিজেদের ইচ্ছাকে সংযত করেও তারা পরিবারের সবার জন্য কিছু না কিছু কেনার চেষ্টা করেন। সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যেও তাদের আনন্দে কোনো কমতি থাকে না। কারণ তাদের কাছে ঈদের আনন্দ শুধু নতুন পোশাকেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এবং পারস্পরিক ভালোবাসা বিনিময়ের মধ্যেই তারা প্রকৃত আনন্দ খুঁজে পান।
সমাজের আরেকটি বাস্তব চিত্র দেখা যায় ফুটপাতের দোকানগুলোতে। শহরের ফুটপাতজুড়ে বসে ছোট ছোট অস্থায়ী দোকান। সেখানে কম দামে বিভিন্ন ধরনের পোশাক বিক্রি হয়। অনেক মানুষ আছেন যারা শপিং মলের দামি পোশাক কিনতে পারেন না। তাই তারা ফুটপাত থেকেই নিজের সাধ্যের মধ্যে পোশাক কিনে নেন। সেই পোশাকই তাদের কাছে ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে ওঠে। ছোট্ট একটি নতুন জামা কিংবা একটি স্যান্ডেল এই সামান্য জিনিসও তাদের মনে অপরিসীম সুখ এনে দেয়। অল্পের মধ্যেই তারা খুঁজে পান সন্তুষ্টি।
গ্রামবাংলার ঈদের চিত্রও কিছুটা ভিন্ন। সেখানে মানুষ অনেক সময় খুব সীমিত আয়োজনের মধ্যেই ঈদ উদযাপন করেন। গ্রামের মানুষদের কাছে ঈদের আনন্দ অনেক বেশি সরল ও আন্তরিক। নতুন পোশাকের পাশাপাশি তারা গুরুত্ব দেন পারিবারিক মিলনমেলায়। ঈদের দিন সকালে নামাজ শেষে একে অন্যের বাড়িতে যাওয়া, মিষ্টি বা সেমাই খাওয়া এবং কুশল বিনিময়- এসবই তাদের ঈদের আনন্দকে পূর্ণতা দেয়। এই সরলতাই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। ঈদের এই ভিন্ন ভিন্ন চিত্র আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরে- আমরা কি সত্যিই ঈদের প্রকৃত শিক্ষা ধারণ করতে পারছি? ইসলাম আমাদের শেখায় সহমর্মিতা, সাম্য ও মানবিকতার শিক্ষা।
ঈদের আনন্দ শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য নয়; বরং তা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য। সমাজের সচ্ছল মানুষরা যদি অসচ্ছলদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে ঈদের আনন্দ আরও অনেক মানুষের জীবনে পৌঁছে যেতে পারে।
একটি নতুন পোশাক, কিছু খাবার বা সামান্য সহযোগিতাও অনেক মানুষের জীবনে বড় সুখ এনে দিতে পারে। বাস্তবতা হলো- জীবন সবার জন্য সমান নয়। কারও কাছে ঈদ মানে বিলাসী কেনাকাটা ও আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন, আবার কারও কাছে ঈদ মানে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর ছোট্ট চেষ্টা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আনন্দের প্রকৃত উৎস মানুষের মনেই লুকিয়ে থাকে। অনেক সময় অল্প কিছুতেই মানুষ সবচেয়ে বড় সুখ খুঁজে পায়।
ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্যও এখানেই- ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভাগাভাগির মধ্যে। তাই আমাদের উচিত ঈদের আনন্দকে শুধু ব্যক্তিগত উৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। ধনী-গরিবের পার্থক্য ভুলে আমরা যদি একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারি, তাহলে ঈদ সত্যিকার অর্থেই হয়ে উঠবে সবার উৎসব।
