রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে

নুসরাত সুলতানা, শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি তারা হলো প্রবাসী। সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সংখ্যা বেশি। বেসরকারি তথ্য মতে, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ কর্মরত রয়েছে। এসব দেশের মধ্যে সৌদি আরবে প্রবাসীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই বিপুল সংখ্যক প্রবাসীরা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে প্রবাস জীবন পার করেন। কোন প্রবাসী মারা গেলে, পঙ্গুত্ব বরণ করলে বা অন্য কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হলে সাময়িক আলোচনা সমালোচনা হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না যা আমাদের দেশের শ্রমবাজারের ক্ষতি করছে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহের রেকর্ড ভঙ্গ করে প্রায় ৩২৮২ কোটি (৩২.৮২ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। চলতি বছরও পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে যা পূর্বের বছরগুলোর তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি। প্রবাসীরা দেশের কল্যাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলে তাদের কল্যাণে করা আইনসমূহ কার্যকর হয় না।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩: এটি অভিবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ অভিবাসন এবং রিক্রুটিং এজেন্সির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড আইন, ২০১৮: এই আইনের অধীনে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসীদের কল্যাণমূলক সহায়তা, মৃতদেহ দেশে আনা, বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক পরিচালনা এবং পরিবারের সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক আইন, ২০১০: বিদেশে গমনেচ্ছু ও প্রত্যাগত প্রবাসীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বিনিয়োগ এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর সুবিধা প্রদানে এই আইন করা হয়েছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৭: এটি জনশক্তি রপ্তানি এবং অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতি, ২০১৬: অভিবাসীদের অধিকার রক্ষা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বিদেশ যাত্রাকালে কম খরচে স্বাস্থ্য পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করে।

প্রবাসীদের কল্যাণে করা আইন সম্পর্কে জানেন না অনেক প্রবাসী বা বিদেশ যেতে চায় এমন ব্যক্তিরা। বিভিন্ন সময়ে এসব আইন প্রণয়ন করা হলেও তার সঠিক প্রয়োগের অভাবে প্রবাসীরা যোগ্যতা অনুসারে চাকরি না পাওয়া, মালিক কর্তৃক অত্যাচারিত হওয়া, প্রতারণার শিকার হওয়াসহ অন্যান্য অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সম্প্রতি এসব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। এরইমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে প্রবাসী মারা যাওয়ার খবর শোনা যায়। মধ্যপ্রাচ্যগামী অনেক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। এতে প্রবাসীদের চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজে উন্নত বিশ্বের চাহিদা ও যোগানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে বাংলাদেশের শ্রমশক্তির চাহিদা কমে যাবে, কর্মসংস্থান হারাবে বিপুল সংখ্যক মানুষ। যা আমাদের শ্রমবাজারে সংকট সৃষ্টি করবে। যাদের কাঁধে দেশের অর্থনীতি তাদের অনিশ্চিত জীবন আর নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে চলা জাতির জন্য লজ্জাজনক। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। তাই প্রবাসীদের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে আরও তৎপর আর কার্যকরি ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু মারা গেলে আর্থিক অনুদান আর শোক প্রকাশে সীমাবদ্ধ না থাকুক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাজ। দূতাবাসগুলোকে আধুনিকায়ন করা যাতে প্রবাসীরা ঘরে বসে তাদের ভিসা সম্পর্কিত অন্যান্য কাজ করতে পারে, ঘরে বসে অভিযোগ জানাতে পারে। সরকারের উচিত প্রবাসীদের সমস্যা শোনা আর সে অনুসারে কাজ করা। বিদেশ যেতে হলে বড় নেতা বা দলালের সাহায্য নিতে হবে এমন চিন্তা ভাবনা যাতে না করতে হয়।