রিলসের আগ্রাসনে হারিয়ে যাচ্ছে যুব সমাজ

মোজাহিদ হোসেন, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির যুগে পৃথিবীর সমস্ত কিছুই মানুষের আয়ত্তে। যার বদৌলতে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে সেকেন্ডেই যোগাযোগ সম্ভব হয়ে উঠেছে। মানুষের জীবনকে করেছে অত্যন্ত সহজ। তবে এই আধুনিক প্রযুক্তি একদিকে যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করছে অন্যদিকে মানুষের জীবন ধ্বংসের সর্বোচ্চ প্রান্তে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে যুবসমাজের কাছে। ফোনের অপব্যবহারে এই প্রজন্ম ক্রমান্বয়ে মেধাহীনে পরিণত হচ্ছে।

আধুনিক প্রযুক্তির সুবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগের পথ অনেক সহজ হয়েছে। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার, এক্স, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে। বর্তমান যুগে ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার কাছেই স্মার্ট ফোন। সব ফোনেই আছে ফেসবুক, ইউটিউবসহ সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এ্যাপস । কেউ এসবের সঠিক ব্যবহার করতেছে। কেউ ভুল দিকে যাচ্ছে। তবে ভুলের দিকে যাওয়ার সংখ্যাটাই বেশি।

বর্তমান এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বিনোদনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ গেমস খেলছে, কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা শর্ট ভিডিয়ো, রিলস দেখে সময় অপচয় করতেছে। সময়ের সঠিক ব্যবহারের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বর্তমান সময়ে কোনো এক জায়গায় কয়েকজন যুবক বসে থাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে গেলেও কেউ কারও সঙ্গে সরাসরি কথা বলছে না। ফোনের গেম বা রিলসেই আটকে গেছে। বাসে বা ট্রেনে যাতায়াত করলে স্টেশনগুলোতে এরকম দৃশ্য চোখে পড়ে। এমনি এখন গ্রামেও এরকম দৃশ্য চোখে পড়ে। শহর থেকে গ্রামে চলে গেছে। এর প্রবণতা বেড়েই চলেছে। মাঝে মধ্যে পরিবার থেকে ফোন কিনে না দেওয়ায় বা এমবি কেনার জন্য টাকা না দেওয়ায় আত্মহত্যার খবরও শোনা যায়। আজকের যুবসমাজ আটকে গেছে ফোনের অন্ধকার জগতে।

আবার, ফোনে একবার রিলস দেখা শুরু করলে নিমিষেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা শেষ হয়ে যায় ; বুঝার উপায় থাকে না। রিলস মূলত ছোট্ট ভিডিয়ো, টিকটিক যা সাময়িক আনন্দ দেয়। কিন্তু মস্তিষ্কের জন্য নেতিবাচক বিক্রিয়া ঘটায়। বর্তমান সমাজ এমন এক জায়গায় চলে গেছে, কেউ রিলস বা টিকটিক বানাতে ব্যস্ত কেউ এসব দেখতে ব্যস্ত। দু’য়ের কোনোটাই স্বাভাবিক সুস্থ্য মানুষের কাজ নয়। আর এরা টিকটিক বা রিলস তৈরি করতে বেঁচে নেয় বিকৃত, অশ্লীল ও অসামাজিক কন্টেন্ট। ভালো মানের কন্টেন্ট খুবই কম পাওয়া যায়। আবার কিছু ভালো থাকলেও এসব ভালো কন্টেন্ট হারিয়ে যায় অশ্লীল, অসামাজিক কন্টেন্টের প্রভাবে। এসব একদিকে যেমন যুবসমাজকে ধ্বংস করতেছে, অন্যদিকে পুরো সমাজকেই ধ্বংসের দারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

রিলস মানুষের ধৈর্য শক্তি কমিয়ে দিচ্ছে সহজেই। কিন্তু কেউ বুঝতে পারছে না। পূর্বে যখন স্মার্ট ফোন ছিল না, সেই সময়ে মানুষ টেলিভিশনে বাংলা ছায়াছবি দেখতে বা নাটক দেখতো। সেটা এক ঘন্টা বা বেশি অথবা কম হতে পারে, দেখা শুরু করলে শেষ করতো। কিন্তু এখন এমন এক পর্যায়ে যুবসমাজ চলে গেছে, কাউকে এক ঘণ্টার কোনো নাটক দেখার কথা বললে বলবে এত সময়ের নাটক দেখা সম্ভব না। কিন্তু সেই একই ব্যক্তি ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিলস দেখে নষ্ট করতেছে। সেই রিলস পাঁচ বা সাত সেকেন্ডের। আবার অনেকে এই পাঁচ বা সাত সেকেন্ডের রিলস শেষ হতে না হতেই পরিবর্তন করে অন্য রিলসে চলে যায় দুই তিন সেকেন্ড পর পর পরিবর্তন করে । এর থেকে বোঝা যায় মানুষের ধৈর্যশক্তি কয়েক সেকেন্ডে বন্দি হয়ে গেছে। ধৈর্য শক্তি কমে গেছে। আবার দেখা যায় এই রিলস মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হয়ে গেছে। একজন রিলস দেখতেছে, সেটা ভালো লাগলে বা তার জীবনের সঙ্গে একটু মিল থাকলে অন্য আরেকজনের মেসেঞ্জারে পাঠায় দেখার জন্য। এ থেকে বোঝা যায় মানুষের মধ্যে যে পারস্পরিক ভাব আদান প্রদান, যেটা সরাসরি করা দরকার, সেটা এখন রিলসে চলে গেছে। এটা কখনই একজন যুবকের জন্য ভালো হতে পারে না।

এখন, বিশেষ করে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা, যাদের পড়াশোনার অবস্থা তলানিতে কিন্তু ফোন ব্যবহারের দিক থেকে যথেষ্ট পারদর্শী। এই রিলসের আগ্রাসনে যুবসমাজ ধ্বংসের পথে। প্রথমত, ক্রমান্বয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। কিন্তু বুঝার সক্ষমতা নেই। আবার কেউ বুঝেও এখান থেকে বের হতে পারছে না। এর মধ্যে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস হচ্ছে। বর্তমান যুবসমাজ কোনো কিছু দীর্ঘ সময় ধরে মনে রাখতে পারে না। কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। শিক্ষক ক্লাসে লেকচার দিয়েই যায় কিন্তু শিক্ষার্থীদের মন পড়ে থাকে অন্য কিছুতে। তৃতীয়ত, এই রিলস মানুষকে ধীরে ধীরে সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বাবা-মা, ভাই-বোন বা বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার সময় হয় না, কথা বলার সময় হয় না, কিন্তু রিলস দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায়। চতুর্থত, ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। বর্তমান যুবসমাজের অধিকাংশই রাতে ঘুমায় না। সারারাত জেগে রিলস দেখে, ফেসবুকিং করে, ঘুমাতে যায় শেষ রাতে। অথচ রাতের ঘুম ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য বিষয়। এর জন্য যেমন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে তেমনি পড়াশোনা থেকেও বিচ্ছিন্ন করে। আবার রিলস দেখার এই সাময়িক আনন্দের ফলে প্রতিনিয়ত ডোপামিন নিঃসরণ হচ্ছে। অনেক সময় অশ্লীল কন্টেন্ট দেখার কারণে অশ্লীল কাজ করতেও দ্বিধাবোধ জাগ্রত হয় না।

এর থেকে পরিপূর্ণ উত্তরণের উপায় অজানা। তবে রিলস বা গেম থেকে দূরে সরাতে না পারলে আগামী প্রজন্ম অন্ধকারে ছেয়ে যাবে। আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। এর জন্য প্রত্যেক পরিবারকে সচেতন হতে হবে। পরিবারগুলোতে দেখা যায়, ছোট বাচ্চারা কান্না করলে বা ভাত খেতে না চাইলে হাতে ফোন দিয়ে দেয়। এর ফলে ধীরে ধীরে সেই বাচ্চাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ফোন দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। সেই বাচ্চা ধীরে ধীরে ফোনের প্রতি আসক্ত হয়ে যায়।

এর থেকে পরিবারকে সম্পূর্ণ সচেতনতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এছাড়া নিজেকে এই জগত থেকে দূরে রাখতে ব্যক্তিগত দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। ফোনের ব্যবহার কমাতে হবে। ফোনকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে হবে। ফোন যেন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। এর জন্য সমাজে ব্যতিক্রম কার্যক্রম চালু করতে হবে। যেমন- ফুটবল, ক্রিকেট, হাডুডু ইত্যাদি খেলার প্রসার ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। গ্রামে এখন ছোটদের খেলাধুলা হারিয়ে গেছে, সেগুলো ফেরাতে হবে। যেমন- কানামাছি ভোঁ ভোঁ, গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা ইত্যাদি। এই রিলসের আগ্রাসন থেকে যুবসমাজকে উদ্ধারের জন্য একদিকে যেমন পরিবারের অভিভাবকদের পদক্ষেপ নিতে হবে আরেকদিকে সরকারের উচিত এ বিষয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সরকারি নীতিমালা প্রনয়ণ ও বাস্তবায়ন করা। এক্ষেত্রে ফোন ব্যবহার ও ফেসবুক আইডি খোলার জন্য নির্দিষ্ট বয়স বেঁধে দেওয়া। জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। সর্বপরি, প্রত্যেককে সচেতন করে তুলতে হবে।