শিক্ষা থেকে কর্মক্ষেত্র : নারীর অগ্রযাত্রা ও চ্যালেঞ্জ
মো. আমিনুর রহমান, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
শিক্ষা থেকে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত নারীর অগ্রযাত্রা বলতে বোঝায় জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে আত্মনির্ভর হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা। শিক্ষা নারীর ক্ষমতায়নের ভিত্তি তৈরি করে, আর সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই নারীরা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতা, মেধা ও সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে। তবে এই অগ্রযাত্রা একেবারে বাধাহীন নয়; পথচলায় রয়েছে সামাজিক বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা, বেতন বৈষম্যসহ নানা প্রতিকূলতা। তবুও এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে নারীরা ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছে এবং দেশের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
মূলত নারীর ক্ষমতায়ন বলতে বোঝায় দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা। সেই সুযোগের সূচনা হয় শিক্ষা থেকে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বৈষম্যমূলক আইনের পরিবর্তন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং নারীর কাজের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান।
বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি (৫০.৪৩ শতাংশ) নারী। তাই দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে হলে নারীসমাজকে সঙ্গে নিয়েই অগ্রসর হতে হবে। দেশে বর্তমানে প্রায়োগিক সাক্ষরতার হার (৭+ বয়সে) ৬২.৯২ শতাংশ। তবে ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের মধ্যে সাক্ষরতায় নারীরা পুরুষদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ অনুযায়ী, দেশের সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও নারীরা ক্রমেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করছে। শিক্ষায় এই অগ্রগতি নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ ইতিবাচক আভাস দিচ্ছে।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রায় সর্বক্ষেত্রেই নারীরা নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করছে। প্রায় সব পেশাতেই নারীদের উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৫৫ শতাংশ শ্রমিকই নারী। এছাড়া শিক্ষকতা, ব্যাংকিং, সরকারি মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, উদ্যোক্তা কার্যক্রম এমনকি আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
বাংলাদেশে জিডিপিতে পুরুষ এবং নারীর অবদান প্রায় সমান। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০২০ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। তবে সংসারের ভেতর ও বাইরের কাজের মূল্য ধরা হলে নারীর অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। এর অর্থ হলো, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী-পুরুষের অবদান বলা যায় সমান সমান। তবে কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য কিন্তু মোটেও সমান নয়। আবার পরিসংখ্যান ব্যুরোর আরেকটি জরিপ জানাচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণ যেখানে ৫০ দশমিক ৮৮ শতাংশ সেখানে শহরে সেই হার ২২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
নারীদের এই অগ্রযাত্রার পথ পুরোপুরি মসৃণ নয়। বেতন বৈষম্য, পদোন্নতিতে সীমাবদ্ধতা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, নারী সুরক্ষা আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের অভাব এবং পারিবারিক দায়িত্বের চাপ- এসব এখনও নারীর অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নারী অধিকার ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, বাল্যবিবাহ, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, লিঙ্গ বৈষম্য, অসম বেতন, সাইবার হয়রানি এবং সমাজের একাংশের নেতিবাচক মনোভাব।
বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ফোরাম (ডব্লিউইএফ) এক গবেষণায় জানায়, বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য প্রায় ২৮ শতাংশ। এছাড়া অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য এখনও ৫৬ শতাংশ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো নারী সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা। অনেক ক্ষেত্রে নারী নিজের পরিবারেও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রে নারী নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হয়। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কমপক্ষে ২০৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৮২৮ জন ধর্ষণের শিকার এবং তাদের মধ্যে ৪৭৪ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। এছাড়া ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’ অনুসারে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় অন্তত একবার ঘরোয়া সহিংসতার শিকার হন। এটি নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও সামাজিক অংশগ্রহণকে দুর্বল করে দেয়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের এক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী শ্রমিক ১৮ বছরের আগেই বিয়ে করেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মজীবনে। বিশেষ করে নারী পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে বাল্যবিবাহের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। নারীর অগ্রযাত্রায় চ্যালেঞ্জ বেশি হওয়া সত্ত্বেও দিন দিন নারীদের অগ্রগতি তা ছাপিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। নারীর উন্নয়ন শুধু নারীর ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়; এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বৃহত্তর নারীসমাজকে পিছিয়ে রেখে কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। উন্নয়ন কাঠামোর প্রতিটি স্তরে নারীর পূর্ণ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা গেলে তবেই সম্ভব একটি টেকসই ও ন্যায়সংগত ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণ।
