বইমেলা : অতীতের স্মৃতি, ভবিষ্যতের প্রত্যাশা

ওরাইনা খাঁন চৌধুরী, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় বইমেলা মানেই ছিল এক টুকরো স্বপ্নের দেশ। ফেব্রুয়ারির মৃদু হাওয়ায়, ভাষার মাসের আবেগে হৃদয়ের গভীর থেকে ভেসে আসত নতুন বইয়ের গন্ধ। অমর একুশে বইমেলা তখন শুধু একটি মেলা ছিল না- ছিল অনুভূতির মিলনমেলা, শব্দের উৎসব, আলোর যাত্রা। ফেব্রুয়ারির প্রতিটি বিকাল যেন রঙিন হয়ে উঠত বইয়ের মলাটে, লেখকের স্বাক্ষরে, আর পাঠকের উচ্ছ্বাসে। সেই সময় বইমেলায় যাওয়ার প্রস্তুতিও ছিল একধরনের উৎসব। সারাবছর টিফিনের টাকা জমিয়ে রাখা, প্রিয় লেখকের নতুন বই কিনব বলে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা উত্তেজনা- সে এক অন্যরকম আনন্দ। অনেকের কাছে হয়তো তা ছিল ছোট্ট সঞ্চয়, কিন্তু সেই সঞ্চয়ের ভেতর ছিল অগাধ ভালোবাসা। স্টল থেকে স্টলে ঘোরা, নতুন প্রচ্ছদে হাত বুলানো, পাতা উল্টে কাগজের গন্ধে ডুবে যাওয়া- মনে হতো, যেন নিজের জন্য একখণ্ড পৃথিবী কিনে নিচ্ছি। বই ছিল তখন আত্মার সম্পদ, মননের খাদ্য, ভবিষ্যতের দিশারি। বইমেলার প্রাঙ্গণ ছিল এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক অঙ্গন। রুচিশীল ও মানসম্পন্ন বইয়ের সমাহার চোখে পড়ত সর্বত্র। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণা, অনুবাদ- সাহিত্যের নানামাত্রিক উপস্থিতি মেলাকে করে তুলত বুদ্ধিবৃত্তিক উৎসবে পরিণত। লেখক-পাঠকের আন্তরিক আলাপ, নতুন বই নিয়ে আলোচনা, সমসাময়িক সাহিত্যচর্চা- সব মিলিয়ে সেখানে তৈরি হতো এক চিন্তাশীল পরিবেশ। মনে হতো, এ শুধু বেচাকেনার জায়গা নয়; এ এক মননের মিলনক্ষেত্র। কিন্তু সময়ের স্রোত থেমে থাকে না। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, বাজারকেন্দ্রিক চিন্তার উত্থান- সব মিলিয়ে বইমেলার চেহারাও বদলেছে। এখন বইয়ের পাশাপাশি প্রচারের ঝলকানিও চোখে পড়ে বেশি। অনেক ক্ষেত্রে রুচির চেয়ে বাজারের চাহিদাই বড় হয়ে উঠছে। কোন বই কত বিক্রি হলো, কে কতটা আলোচনায় এলো- এসব প্রশ্ন যেন সাহিত্যমানের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন লেখক তৈরির সুযোগ এনে দিয়েছে- এটি ইতিবাচক দিক। অনেক তরুণ-তরুণী এখন সহজেই নিজেদের ভাবনা প্রকাশ করতে পারছেন। কিন্তু কনটেন্ট তৈরির তাড়নায় যখন বই প্রকাশের সংখ্যা বাড়ে, তখন প্রশ্নও জাগে- সব লেখা কি সত্যিই সাহিত্য হয়ে ওঠে? জনপ্রিয়তা কি সবসময় মানের প্রতীক? দ্রুত বিক্রির উদ্দেশে প্রকাশিত অনেক বই হয়তো মুহূর্তের উত্তেজনা তৈরি করে, কিন্তু সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে কতটি? রুচিশীল ও গভীর মননশীল বইয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে- এমন অভিযোগও শোনা যায়। যদিও বাস্তবতা হয়তো এত সরল নয়; ভালো বই এখনও প্রকাশিত হচ্ছে, পাঠকও পাচ্ছে। তবে প্রচারের ভিড়ে সেসব বই অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। ফলে পাঠকের দায়িত্বও বেড়েছে। সচেতন পাঠকই পারে ভালো বইকে বেছে নিতে, তাকে আলোয় আনতে। তবে পরিবর্তন মানেই পতন নয়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বইমেলার রূপ বদলেছে, কিন্তু তার প্রাণশক্তি এখনও অটুট। এখনও অসংখ্য তরুণ-তরুণী বই হাতে মেলায় ঘোরেন, প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ নেন, আলোচনায় অংশ নেন। বইমেলা এখনও অনেকের কাছে মিলনমেলা, বন্ধুত্বের স্মৃতি, নতুন ভাবনার সূচনা। নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি প্রমাণ করে- বইয়ের প্রতি ভালোবাসা নিঃশেষ হয়নি; বরং তার প্রকাশভঙ্গি বদলেছে। বই মানে শুধু মলাটবন্দি কাগজ নয়, বই মানে আত্মজাগরণ। একটি ভালো বই একজন মানুষকে বদলে দিতে পারে, সমাজকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- চিন্তার পরিবর্তন থেকেই সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। আর সেই চিন্তার বীজ বপন করে বই। তাই বইমেলা শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি একটি জাতির মননচর্চার প্রতীক। একাল-সেকালের তুলনায় কিছু আক্ষেপ থাকতেই পারে। স্মৃতির আলো সবসময়ই বর্তমানের চেয়ে উজ্জ্বল মনে হয়। তবু আমাদের দায়িত্ব বর্তমানকে অস্বীকার করা নয়, বরং তাকে পরিশীলিত করা। প্রকাশকদের উচিত মানসম্পন্ন পাণ্ডুলিপিকে গুরুত্ব দেওয়া, লেখকদের উচিত গভীর মনন ও সৃজনশীলতায় মনোযোগী হওয়া, আর পাঠকদের উচিত সচেতন নির্বাচনে অভ্যস্ত হওয়া। তবেই বইমেলা তার আসল মর্যাদা ফিরে পাবে। সবচেয়ে বড় কথা, নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই বইমেলা এগিয়ে যাবে বহুদূর।

তরুণদের স্বপ্ন, প্রশ্ন ও কৌতূহলই বইয়ের প্রাণশক্তি। তারা যদি বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখে, যদি জ্ঞানের আলোকে আঁকড়ে ধরে, তবে বইমেলার যাত্রা থামবে না। বরং আরও বিস্তৃত হবে তার পরিসর, আরও গভীর হবে তার প্রভাব। বইমেলা হোক আবার রুচির, চিন্তার ও সৃষ্টির মিলনমেলা- যেখানে বাজার নয়, মননই হবে আসল আকর্ষণ। যেখানে জনপ্রিয়তার চেয়ে সাহিত্যমান বড় হয়ে উঠবে। যেখানে বই কেনা মানে শুধু একটি পণ্য কেনা নয়, বরং নিজের ভেতর একটি নতুন জানালা খুলে দেওয়া। সেই প্রত্যাশাতেই প্রতি বছর আমরা ফিরে যাই বইয়ের কাছে, নিজের কাছে। ফিরে যাই আলোর সন্ধানে, শব্দের আশ্রয়ে। কারণ যতদিন মানুষ স্বপ্ন দেখবে, প্রশ্ন করবে, জানতে চাইবে- ততদিন বইমেলা থাকবে। একাল-সেকালের ভিন্নতায় তার রূপ বদলাতে পারে, কিন্তু তার অন্তরস্থ আলো নিভে যাবে না। বরং সময়ের স্রোত বেয়ে সে এগিয়ে যাবে- নতুন প্রজন্মের হাত ধরে, নতুন স্বপ্নের দিগন্তে।