বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা : সময়ের দাবি ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীর অন্যতম প্রধান শর্ত হলো পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, আমাদের দেশের শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জ—সর্বত্রই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আজ এক চরম বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ, ড্রেন বা জলাশয়ে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ এবং বর্জ্য অপসারণের সেকেলে পদ্ধতি আমাদের পরিবেশকে শুধু দূষিতই করছে না, বরং জনস্বাস্থ্যকে ঠেলে দিচ্ছে এক ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের এক অপরিহার্য দাবি।
আমাদের দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলার পেছনে বেশ কিছু কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ (Source Segregation) না করা। বাসা-বাড়ি বা শিল্পকারখানা থেকে পচনশীল, অপচনশীল এবং চিকিৎসা বর্জ্য সব একত্রে মিশিয়ে ফেলা হয়। এতে করে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভাগুলোর ময়লা সংগ্রহের ট্রাক বা ডাস্টবিনের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দিনের ব্যস্ত সময়ে খোলা ট্রাকে করে ময়লা পরিবহন করা হচ্ছে, যা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পথচারীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। এছাড়া, আমাদের দেশে এখনও ‘ওপেন ডাম্পিং’ বা উন্মুক্ত স্থানে ময়লা ফেলার সংস্কৃতি বজায় আছে, যা মাটির নিচে পানি এবং বায়ুমণ্ডলকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না থাকলে তার প্রথম আঘাত আসে জনস্বাস্থ্যের ওপর। যত্রতত্র পড়ে থাকা বর্জ্য মশা, মাছি ও ইদুরের বংশবিস্তারের সহায়ক হয়ে ওঠে, যা থেকে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও কলেরার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বর্ষাকালে ড্রেনে প্লাস্টিক ও পলিথিন জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, যা নগরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্তব্ধ করে দেয়।
এর চেয়েও ভয়াবহ হলো চিকিৎসা বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনা। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ক্ষতিকর বর্জ্য যদি সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মেশানো হয়, তবে তা থেকে হেপাটাইটিস বি বা সি-এর মতো মরণব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য থেকে নিঃসৃত সীসা ও পারদ মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানুষের কিডনি ও লিভারের ক্ষতি করছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনতে হলে আমাদের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নিচে কিছু কার্যকর পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হলো-
উৎসস্থলে পৃথকীকরণ : প্রতিটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠানকে পচনশীল (সবজির খোসা, খাবার) এবং অপচনশীল (প্লাস্টিক, কাগজ, কাঁচ) বর্জ্য আলাদা দুটি বিনে রাখার অভ্যাস করতে হবে। সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনকে রঙভেদে ভিন্ন ভিন্ন বিন সরবরাহ করতে হবে।
বর্জ্য থেকে সম্পদ (Waste to Wealth) : বর্তমান বিশ্বে বর্জ্যকে সমস্যা নয়, বরং সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার এবং অপচনশীল বর্জ্য রিসাইক্লিং করে নতুন পণ্য তৈরি করা সম্ভব। এছাড়া ইনসিনারেটর প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ : ‘একবার ব্যবহারযোগ্য’ বা সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহার কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। পাটের ব্যাগ বা পচনশীল উপকরণের ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত করতে হবে।
আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা : দিনের বেলা নয়, বরং গভীর রাতে বা ভোরের আলো ফোটার আগে ঢাকা কভার্ড ভ্যানে করে বর্জ্য অপসারণ করতে হবে। এতে জনভোগান্তি কমবে এবং শহরের দৃশ্য দূষণ রোধ হবে।
আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা : শুধু আইন দিয়ে সবকিছু সম্ভব নয়, প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং গণমাধ্যমে প্রচার চালাতে হবে। তবে যেখানে সচেতনতা কাজ করে না, সেখানে জরিমানা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও হতে হবে স্মার্ট। অনেক দেশ এখন সেন্সরযুক্ত ডাস্টবিন ব্যবহার করছে যা পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বার্তা পাঠিয়ে দেয়। এছাড়া জিআইএস (GIS) ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহের রুটগুলো অপ্টিমাইজ করা যেতে পারে। ল্যাট্রিন বা স্যানিটারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশে ‘ফেকাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট’ (FSM) ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। এতে নদী ও জলাশয়ের পানি দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা। আপনার ফেলা একটি চিপসের প্যাকেট বা পানির বোতল যদি ড্রেন বন্ধ করে দেয়, তবে তার ভোগান্তি দিনশেষে আপনার ওপরই বর্তাবে।
সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করতে হবে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি বিনিয়োগ বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) উৎসাহিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল পরিবেশই পারে আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ পৃথিবী নিশ্চিত করতে। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমেই সম্ভব টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন করা।
