সভ্যতার মুখোশের আড়ালে বর্বরতা
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আমরা নিজেদের আধুনিক বলি। প্রযুক্তির উৎকর্ষ, উচ্চশিক্ষার বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকৃত বিস্ফোরণ- সব মিলিয়ে আমরা এক উন্নত সভ্যতার নাগরিক বলে দাবি করি। কিন্তু প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললেই যে চিত্র আমাদের চোখে পড়ে, তা এই দাবিকে নির্মমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। নারী হয়রানি, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন- এসব যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সভ্যতার উজ্জ্বল আলোর নিচেই বর্বরতার অন্ধকার ঘনীভূত হচ্ছে। তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা যেন ধীরে ধীরে মধ্যযুগীয় বর্বরতার প্রতিনিধিত্ব করছে। একটি সমাজ কতটা সভ্য, তা তার অবকাঠামো বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয়; বরং বোঝা যায় সে সমাজ তার নারী ও শিশুদের কতটা নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিতে পারে। কারণ নারী ও শিশুই সমাজের সবচেয়ে মূল কেন্দ্রস্বরূপ। নারী- জাতির প্রসবিনী, শিশু- নতুন ভবিষ্যতের নির্মাতা। সৎসঙ্গ প্রতিষ্ঠাতা শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেন, ‘নারী হইতে জন্মে ও বৃদ্ধি পায়- তাই নারী জননী; আর এমনই করিয়া সে জাতিরও জননী’। এই উক্তি থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায়, নারীজাতি জাতির প্রসবিনী। সেই মূলকেই যদি আমরা অবজ্ঞা করি, তাদের যদি রাস্তায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, এমনকি নিজ ঘরেও নিরাপদ না রাখি- তাহলে সেই সমাজের সভ্যতার দাবি নিছক ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়।
নারী হয়রানি এখন বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। রাস্তাঘাটে কটূক্তি, কর্মক্ষেত্রে মানসিক নিপীড়ন, অনলাইনে অপমান ও হুমকি- সবই এক ধরনের সহিংসতা। অনেক ক্ষেত্রেই এসবকে ‘ছোটখাটো’ ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই ছোট ছোট অবমাননাই বড় অপরাধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। শিশু ধর্ষণ এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। নীরবতা এখানে অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটি দেখা যায় শিশুদের ক্ষেত্রে। ছোট ছোট শিশুরা, যারা পৃথিবীকে চেনে খেলনা আর গল্পের বইয়ের মাধ্যমে, তারাই বিকৃত মানসিকতার মানুষের শিকার হয়। একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়া মানে শুধু একটি জীবনের ক্ষতি নয়; একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করা। এমন অপরাধ শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
প্রশ্ন হলো- এত আইন, এত সচেতনতা কর্মসূচি, এত আলোচনা সত্ত্বেও পরিস্থিতির উন্নতি কেন দৃশ্যমান হচ্ছে না? এর একটি বড় কারণ আমাদের সামাজিক মানসিকতা। আমরা অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করি- সে কোথায় গিয়েছিল, কী পোশাক পরেছিল, কেন একা বের হয়েছিল। এই মানসিকতা অপরাধীকে আড়াল করে এবং ভুক্তভোগীকে দ্বিতীয়বার আঘাত করে। ফলে অনেকেই লজ্জা ও ভয়ের কারণে মুখ খুলতে সাহস পান না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর যদি দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হয়, তাহলে অপরাধীর মনে ভয় জন্মায় না। বরং সে ভাবে- পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব। ন্যায়বিচারের বিলম্ব অনেক সময় ন্যায়বিচারকেই অস্বীকার করে। তাই শুধু আইন প্রণয়ন নয়, তার কার্যকর প্রয়োগই মূল চাবিকাঠি।
তবে দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়; সমাজের, সমাজে বসাবাসরত প্রতিটি নাগরিকের। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সব জায়গায় নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ জোরদার করতে হবে। ছেলে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে- নারী কোনো বস্তু নয়, কোনো ভোগের উপকরণ নয়; তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ এবং তারা জাতির কেন্দ্রস্বরূপ। তাদের মাধ্যমেই একটি প্রজন্ম প্রকাশিত হয়। মিডিয়ার ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা প্রয়োজন। ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা, ঘটনাকে চটকদার করে না তোলা- এসব দায়িত্বশীল আচরণ সমাজকে সুস্থ বার্তা দেয়। একই সঙ্গে ইতিবাচক উদাহরণও তুলে ধরা উচিত, যেখানে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, নীরব দর্শক হয়ে থাকাও এক ধরনের অপরাধ। যখন আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি না, তখন অজান্তেই অন্যায়কে শক্তিশালী করি। প্রতিবাদ মানেই সহিংসতা নয়; প্রতিবাদ মানে সচেতনতা তৈরি করা, সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা, আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা। প্রতিটি মানুষ তার অবস্থান থেকে কিছু না কিছু করতে পারে। নারী ও শিশু যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যান অর্থহীন। আমরা যতই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করি না কেন, যদি আমাদের মনুষ্যত্ব বিকশিত না হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে। আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনা- আমরা কি সত্যিই সভ্য হচ্ছি, নাকি শুধু সভ্যতার মুখোশ পরে আছি? যদি মুখোশের আড়ালে বর্বরতাই লুকিয়ে থাকে, তাহলে সেই মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্র- তিন পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগেই শুধু এই অন্ধকার কাটানো সম্ভব। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়; এটি তাদের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার রক্ষা করতে না পারলে আমাদের সভ্যতার দাবি অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই এখনই সময়- বর্বরতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার, নীরবতা ভাঙার, এবং মানবিক সমাজ গড়ে তোলার। ঋষি মনুর বচনটি উদ্ধৃত করে আলোচনার ইতি টানা যায়-
‘যত্র নার্যস্ত্ত পূজ্যন্তে রমস্তে তত্র দেবতাঃ। যত্রৈতাস্তু ন পূজ্যন্তে সর্বাস্তৎ?াফলাঃ ক্রিয়াঃ।’
অর্থাৎ যেখানে নারীরা সম্মানিত হন, সেখানে দেবতারা প্রীত হন; যেখানে তারা সম্মানিত হন না, সেখানে সব কর্ম নিষ্ফল হয়।
বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
