পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই পর্যটন উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনার গুরুত্ব
এম মহাসিন মিয়া
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে পরিচিত পার্বত্য চট্টগ্রাম। সবুজ পাহাড়, স্বচ্ছ জলধারা, প্রাকৃতিক ঝরনা এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সমন্বয়ে গঠিত এই অঞ্চল দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে। বিশেষ করে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এই তিন জেলা বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত উন্নয়ন, কার্যকর নীতিমালা এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো।
প্রথমত, পার্বত্য অঞ্চলে পর্যটন বিকাশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশগত সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। উন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ পাহাড়ি পথ, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা, বিশ্রাম কেন্দ্র এবং পর্যটন তথ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। পর্যটকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকাগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র চালু করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, পর্যটন খাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আধুনিক রিসোর্ট, হোটেল ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কর সুবিধা প্রদান, সহজ ঋণ প্রাপ্তির ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হলে ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং ও প্রচার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বাংলাদেশ পর্যটন মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই মন্ত্রণালয়ের উচিত পর্যটন সেবার মান নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। পর্যটন গাইডদের জন্য সনদভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা, ভাষা শিক্ষা ও পর্যটন প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তোলা যেতে পারে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনশিল্প টেকসই হতে পারে না। পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, হস্তশিল্প এবং জীবনধারা এই অঞ্চলের প্রধান আকর্ষণ। তাই কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা, বাজার সংযোগ এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করলে তারা সরাসরি পর্যটন অর্থনীতিতে অংশ নিতে পারবে। এতে দারিদ্র্য হ্রাস এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পর্যটক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরাপত্তা টহল বৃদ্ধি, পর্যটন স্পটে সিসিটিভি নজরদারি এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এজন্য সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পার্বত্য অঞ্চলে স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা দ্রুত মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত বিশেষ ইউনিট থাকা জরুরি। পর্যটকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যসেবা ব্যবস্থা চালু করলে নিরাপত্তা বিষয়ে আস্থা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি গুজব ও অপপ্রচার রোধে প্রশাসনের দ্রুত তথ্য প্রকাশ ব্যবস্থা থাকতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, বন উজাড় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব পাহাড়ি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই ইকো-ট্যুরিজম নীতিমালা বাস্তবায়ন করা জরুরি। প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব স্থাপনা নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। অনলাইন বুকিং ব্যবস্থা, পর্যটন তথ্য অ্যাপ এবং ভার্চুয়াল ট্যুর প্ল্যাটফর্ম চালু করলে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়বে।
আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় অংশগ্রহণ এবং বৈশ্বিক পর্যটন সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং জাতীয় ঐক্য, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। পর্যটন শিল্প বিকশিত হলে স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নত হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।
?সর্বোপরি, পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি নিরাপদ, আধুনিক এবং টেকসই পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকার, প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী, স্থানীয় জনগণ এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিকল্পিত উন্নয়ন, শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই অঞ্চল ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্প নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে, এটাই প্রত্যাশা।
এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক ও লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা
