জ্বালানি সংকট : সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা সময়ের দাবি

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকট একটি প্রকট সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আধুনিক সভ্যতার চাকা সচল রাখার প্রধান চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি। শিল্প উৎপাদন, কৃষি, পরিবহন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা- সবই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখা এখন সময়ের দাবি।

জ্বালানি সংকটের বহুমুখী কারণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যের অস্থিতিশীলতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সরবরাহ চেইনকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অভ্যন্তরীণভাবেও মজুত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটি অনেক সময় সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তোলে। জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে, যার ফলে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং রফতানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

দেশের কৃষি প্রধান অর্থনীতির জন্য জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সেচ মৌসুমে ডিজেলের সংকট দেখা দিলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি পরিবহন খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা ছাড়া বিকল্প নেই। এই সংকট নিরসনে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ করা প্রয়োজন। একক কোনো বাজার বা অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের পথ প্রশস্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত বাফার স্টক বা আপদকালীন মজুত নিশ্চিত করতে পারলে সাময়িক সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে হলে বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। অনেক সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়। এক্ষেত্রে তদারকি সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি জ্বালানি অপচয় রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করতে হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং অন্যান্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎসের প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। এটি শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক হবে।

সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তার চড়া মাশুল দিতে হয় পুরো জাতিকে। তাই বর্তমান সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমদানির জটিলতা নিরসন, মজুত বাড়ানো এবং অপচয় রোধের মাধ্যমে সরবরাহ ঠিক রাখা গেলে দেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা গড়াই হোক আমাদের আগামী দিনের লক্ষ্য।