বাড়ছে মশা, বাড়ছে উদ্বেগ

ওরাইনা খাঁন চৌধুরী

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি দেশে মশার উপদ্রব উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। সন্ধ্যা নামলেই বাসা-বাড়ি, অফিস কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মশার আক্রমণে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে। মশার প্রকোপ যদি দ্রুত কমানো না হয়, তাহলে পরিস্থিতি খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিগত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি, ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগে বহু মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং অনেকের মৃত্যুও ঘটেছে। ফলে বিষয়টি এখন আর শুধু অস্বস্তির নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে মশাবাহিত রোগের মধ্যে ডেঙ্গু বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগজনক সমস্যা। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যায় এবং অনেক সময় চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খেতে হয়। অনেক পরিবার প্রিয়জন হারিয়ে শোকাহত হয়। এসব ঘটনা আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয় যে, মশা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এখন আর অবহেলার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী বর্ষা এবং অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার কারণে মশার বংশবিস্তার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার যে পরিবর্তন ঘটছে, তা মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। বৃষ্টির পানিতে জমে থাকা পানি, অপরিচ্ছন্ন ড্রেন, খোলা নালা এবং অযত্নে পড়ে থাকা জলাধারগুলো মশার জন্য আদর্শ প্রজননক্ষেত্র হয়ে উঠছে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব কিংবা পানির ট্যাংকেও মশার লার্ভা জন্ম নিতে দেখা যায়।

এসব জায়গায় নিয়মিত নজরদারি না থাকলে খুব সহজেই মশার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে। নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত হওয়ায় বৃষ্টির পানি দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা বসতি, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নোংরা পরিবেশ মশার বংশবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে।

নগর কর্তৃপক্ষ যদি নিয়মিতভাবে ড্রেন পরিষ্কার না করে এবং জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে মশার বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে মাঝে মাঝে মশা নিধনের জন্য মশানাশক ও ফগার মেশিন ব্যবহার করা হয়। এই ফগার মেশিন ধোঁয়ার মাধ্যমে মশা ধ্বংস করার কাজ করে। তবে বাস্তবে দেখা যায়, অনেক আবাসিক এলাকায় বছরে একবার বা খুব সীমিত সময়ের জন্য এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অনেক সময় ফগিং কার্যক্রম নিয়মিত না হওয়ায় এর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু ধোঁয়া দিয়ে পূর্ণবয়স্ক মশা ধ্বংস করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, বরং মশার লার্ভা ধ্বংসের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে, বাংলাদেশে এডিস ও কিউলেক্স মশার দাপট এবং মশাবাহিত রোগে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে মশা নিধনের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। মশার লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে মশার উপদ্রব বরং আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসেও ডেঙ্গুতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ সময় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে অনেক ক্ষেত্রে ওয়ার্ডে জায়গা সংকুলান করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক রোগীকে জরুরি বিভাগে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। চিকিৎসক ও নার্সদের ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, যা স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

এই পরিস্থিতি শুধু স্বাস্থ্যখাতের জন্য নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি ও সমাজের ওপরও প্রভাব ফেলে। পরিবারের একজন সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায় এবং কর্মক্ষম মানুষ কর্মস্থলে যেতে পারে না। এতে পরিবারে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয় এবং মানসিক দুশ্চিন্তাও বাড়ে। তাই মশা নিয়ন্ত্রণকে একটি সাময়িক সমস্যা হিসেবে না দেখে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মশার প্রকোপ কমাতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাসাবাড়ির আশপাশে কোথাও যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। ফুলের টব, পানির ট্যাংক, পরিত্যক্ত পাত্র, ছাদে জমে থাকা পানি কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা উচিত। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং নগর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত প্রয়োজন। অনেক সময় অসচেতনতার কারণে মানুষ নিজের অজান্তেই মশার বংশবিস্তার ঘটার সুযোগ করে দেয়। তাই গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও প্রচারণা চালানো হলে মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে দায়িত্ববোধ বাড়বে। সবশেষে বলা যায়, মশার উপদ্রব এখন আর ছোটখাটো সমস্যা নয়, এটি ধীরে ধীরে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। তাই সময় থাকতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ মানুষ- সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পরিকল্পিত ও নিয়মিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। অন্যথায় ভবিষ্যতে মশাবাহিত রোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, যার প্রভাব পড়বে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর।

ওরাইনা খাঁন চৌধুরী

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়