বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস
আসুন, অধিকার সম্পর্কে জানি ও ন্যায্য দাবি করি
এমডি আনোয়ার হোসাইন
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভোক্তা আন্দোলনের এই বিশ্বব্যাপী জাগরণের মূলে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ১৯৬২ সালের ১৫ মার্চ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি মার্কিন কংগ্রেসে প্রথমবার ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে এক যুগান্তকারী ভাষণ প্রদান করেন, যা ইতিহাসে এই বিষয়ক প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে অমর হয়ে আছে। কেনেডি বলেছিলেন, ‘ভোক্তা মানেই আমরা সবাই; তারা অর্থনীতির বৃহত্তম গোষ্ঠী অথচ তাদের কণ্ঠস্বরই সবচেয়ে কম শোনা যায়।’ কেনেডির সেই চার মৌলিক অধিকার- নিরাপত্তার অধিকার, তথ্য জানার অধিকার, নির্বাচনের অধিকার এবং অভিযোগ জানানোর অধিকার- আজকের বিশ্ব ভোক্তা আন্দোলনের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সাল থেকে ‘কনজ্যুমারস ইন্টারন্যাশনাল’ এই দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস হিসেবে পালন শুরু করে।
বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস ২০২৬ এর মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নিরাপদ পণ্য, আত্মবিশ্বাসী ভোক্তা’ (Safe Products, Confident Consumers)। এই প্রতিপাদ্যটি বর্তমান বিশ্ববাজারের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ পণ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভোক্তার মনে আহস্থা গড়ে ওঠে না। ২০২৬ সালের এই বৈশ্বিক প্রচারণার মূল লক্ষ্য হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তাদের মধ্যে একটি আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করা যা টেকসই উন্নয়নের পথে সহায়ক হবে।
বিশ্বব্যাপী আজ ভোক্তারা নানাভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন যা নৈতিকতা ও বিজ্ঞানের অপব্যবহারের এক চরম উদাহরণ। উন্নত দেশগুলোতে যেমন অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভেজাল খাদ্য ও নকল ওষুধের প্রকোপ জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। ইউরোপ-আমেরিকায় অনেক সময় পণ্যের মেয়াদের বিষয়ে সূক্ষ্ম কারচুপি করা হয়, আবার এশিয়ায় ওজনে কম দেওয়া বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা অহরহ ঘটছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মিথ্যা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করা বিশ্বজুড়ে এক মহামারির আকার ধারণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো পরিবেশের ক্ষতি করে এমন পণ্য বাজারে ছাড়ছে, যা পরোক্ষভাবে ভোক্তাদের বাসযোগ্য পৃথিবীর অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এই প্রতারণার জাল এতটাই বিস্তৃত যে, সচেতন না হলে যেকোনো মুহূর্তেই একজন ক্রেতা নিঃস্ব হতে পারেন।
বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ দেশে এই সচেতনতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। মূলত স্বাধীনতার পর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন আইন থাকলেও ২০০৯ সালে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন’ পাসের মাধ্যমে এ দেশের সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। এই আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’, যা বর্তমানে দেশের বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে অতন্দ্র প্রহরীর মতো কাজ করছে। বাংলাদেশে দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষকে তাদের আইনি অধিকার সম্পর্কে অবহিত করা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সতর্ক বার্তা দেওয়া।
২০২৬ সালের বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে যা জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। রাজধানীসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বর্ণাঢ্য র্যালি, সেমিনার এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে যেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিশিষ্ট নাগরিকরা উপস্থিত থাকছেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভোক্তা অধিকার বিষয়ক কুইজ ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সচেতন হয়ে বেড়ে ওঠে। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে অভিযোগ করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হচ্ছে। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশের মাধ্যমে দিবসটির তাৎপর্য জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বলিষ্ঠ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভোক্তারা প্রতিনিয়ত বহুমাত্রিক প্রতারণার শিকার হচ্ছন যা বর্ণনা করা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য যেমন চাল, ডাল ও ভোজ্যতেলে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভেজাল মেশাচ্ছে, যা ধীর গতির বিষ হিসেবে কাজ করছে। অনেক সময় প্যাকেটজাত পণ্যের ওজন কম দেওয়া বা প্যাকেটের গায়ে লেখা মূল্যের চেয়ে বেশি দাম রাখা এ দেশের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসাক্ষেত্রে নকল ও নিম্নমানের ওষুধের কারণে মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। ই-কমার্স সেক্টরে অগ্রিম টাকা নিয়ে পণ্য না দেওয়া বা ছবির সঙ্গে বাস্তবের পণ্যের আকাশ-পাতাল অমিল রাখা এখন একটি সাধারণ প্রতারণায় পরিণত হয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দ্রব্যের দাম বাড়ানো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাভিশ্বাস বাড়িয়ে তুলছে।
ভোক্তার অধিকারগুলোর যথাযথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের দেশে আইনের আওতায় আটটি মৌলিক অধিকারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এমন পণ্য বা সেবা থেকে সুরক্ষার অধিকার অর্থাৎ নিরাপত্তার অধিকার আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দ্বিতীয়ত, পণ্যের মান, পরিমাণ, বিশুদ্ধতা এবং মূল্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানার অধিকার রয়েছে যা একজন ক্রেতাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। তৃতীয়ত, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ন্যায্য মূল্যে মানসম্মত পণ্য নির্বাচনের সুযোগ পাওয়া ভোক্তার অন্যতম দাবি। এছাড়া রয়েছে শুনানির অধিকার, যেখানে অসন্তুষ্ট ভোক্তা তার অভিযোগ পেশ করতে পারেন এবং প্রতিকার পাওয়ার অধিকার যা আর্থিক বা আইনি ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে। মৌলিক চাহিদা পূরণ, শিক্ষা লাভের অধিকার এবং একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অধিকারও ভোক্তা অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কবিতায় বলেছিলেন, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।’ একজন সচেতন ভোক্তা হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা যখন কোনো পণ্য কিনি, তখন আমাদের উচিত পণ্যের গায়ে দেওয়া উপাদানের তালিকা, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং খুচরা মূল্য ভালো করে যাচাই করা। কোনো অসংগতি দেখলে বা প্রতারিত হলে নিরবে মেনে না নিয়ে নিকটস্থ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানানো উচিত। সম্মিলিত প্রতিবাদ ও সচেতনতাই পারে বাজার ব্যবস্থায় নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে, ভোক্তা অধিকার রক্ষা শুধু একটি আইনি বিষয় নয়, বরং এটি বায়ো-এথিক্স এবং রসায়ন বিজ্ঞানের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত। খাদ্যে ফরমালিন বা কার্বাইডের উপস্থিতি শনাক্তকরণে রসায়ন বিজ্ঞানের ভূমিকা যেমন অপরিসীম, তেমনি ডিজিটাল জালিয়াতি রোধে কম্পিউটার সায়েন্সের সাইবার নিরাপত্তা শাখা কাজ করে যাচ্ছে। আমরা যদি বিজ্ঞানের এই সুবিধাগুলো ব্যবহার করে সচেতন হই, তবে প্রতারকদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া অনেক সহজ হবে।
ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্যিকগণ যুগে যুগে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার প্রেরণা দিয়েছেন। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘একজন ক্রেতা বা ভোক্তা হলেন আমাদের প্রাঙ্গণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শক।’ এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক বিপণন নীতি সাজানো হয়েছে যেখানে ভোক্তাই রাজা। তবে রাজা হিসেবে আমাদের যেমন ক্ষমতা আছে, তেমনি দায়িত্বও আছে- আর তা হলো মিথ্যার কাছে নতি স্বীকার না করা। জালিয়াতি বা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে যদি আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই পণ্য বর্জন করি, তবে অসাধু চক্র পিছু হটতে বাধ্য হবে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়, ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি’- আর একটি নিরাপদ বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হতে পারে আগামীর শিশুদের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার।
বাজার ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি সংগঠনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সংগঠনগুলো ভোক্তাদের আইনি সহায়তা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। তবে শুধু ঢাকা বা বড় শহরে সীমাবদ্ধ না থেকে এই আন্দোলনকে প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের সার্থকতা নির্ভর করে আমাদের প্রত্যেকের ছোট ছোট পদক্ষেপের ওপর। আমরা যখন একটি পণ্যের রশিদ সংগ্রহ করি, তখন আমরা শুধু একজন ক্রেতা থাকি না, বরং আমরা একটি আইনি প্রমাণও সংরক্ষণ করি। এই রশিদই হতে পারে আপনার অভিযোগের প্রধান হাতিয়ার। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর হটলাইন ১৬১২১ এ কল করে অভিযোগ জানানো এখন অনেক সহজ।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস শুধু একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, এটি একটি বৈশ্বিক অঙ্গীকার। পণ্য বা সেবার বিনিময়ে যে অর্থ আমরা ব্যয় করি, তার বিপরীতে সঠিক মান পাওয়া আমাদের করুণা নয়, বরং আইনি ও জন্মগত অধিকার। ‘নিরাপদ পণ্য, আত্মবিশ্বাসী ভোক্তা’- এই প্রতিপাদ্যকে হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে যে আমরা আর কখনই প্রতারিত হব না। বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে এবং মহৎ মনীষীদের আদর্শে বলীয়ান হয়ে আমাদের গড়ে তুলতে হবে এমন এক সমাজ যেখানে ব্যবসায়ীরা হবে সৎ আর ভোক্তারা হবে সচেতন।
আসুন, আমরা অধিকার সম্পর্কে জানি, সঠিক পণ্য নির্বাচন করি এবং ন্যায়ের দাবিতে সোচ্চার হয়ে একটি দুর্নীতিমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। আমরা স্বপ্ন দেখি এমন এক আগামীর, যেখানে কোনো মা-কে ভেজাল দুধের কথা ভেবে চিন্তিত হতে হবে না, কোনো রোগীকে নকল ওষুধের ভয়ে থমকে যেতে হবে না। একটি সুন্দর, নির্মল ও নিরাপদ বাজারের প্রত্যাশায় আমাদের এই নিরন্তর পথচলা অব্যাহত থাকুক। জয় হোক সচেতন নাগরিকের।
