উচ্চশিক্ষায় বাংলা বিষয়ে অনীহা : উদ্বেগজনক বাস্তবতা

মো. আমিনুর রহমান

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা- আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সাহিত্যচেতনার প্রধান ধারক। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে বাংলা শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও দেখা যাচ্ছে, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষার্থী বাংলা বিষয়ে অধ্যয়ন করতে আগ্রহী নয়। এই অনীহা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়; বরং দেশের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক ভাণ্ডারের জন্যও এটি একটি বড় হুমকি।

অনেক শিক্ষার্থীর ধারণা, বাংলা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলে কর্মক্ষেত্র সীমিত হয়ে যায় এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার সুযোগও কম। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ধ্বনি, বর্ণ, ভাষাবিজ্ঞান ও সাহিত্য নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা যেতে চায় না। UNESCO -এর তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যায়। কিন্তু এর মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়ার সংখ্যা অত্যন্ত কম, যা মাতৃভাষা গবেষণার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক বাস্তবতা। তবে দেশের ভেতরেও শিক্ষকতা, গবেষণা, সাংবাদিকতা, প্রকাশনা, অনুবাদ, গণমাধ্যমসহ নানা ক্ষেত্রে বাংলা বিষয়ে দক্ষ মানুষের চাহিদা রয়েছে।

বাংলা বিষয়ে অনীহা তৈরির পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে সাহিত্য পড়া মানেই মুখস্থ করা এবং দীর্ঘ লেখা লিখতে হওয়া। ফলে বিষয়টি তাদের কাছে কঠিন ও চাপের মনে হয়। কিন্তু সাহিত্য মূলত সমাজ, মানুষ ও সময়ের প্রতিফলন। সমাজ ও মানুষের জীবনকে উপলব্ধি করতে পারলে সাহিত্য পাঠও সহজ ও আনন্দময় হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মধ্যে স্বশিক্ষার মনোভাব থাকা জরুরি- অনুসন্ধানী মন, জানার আগ্রহ ও অনুভবের ক্ষমতা থাকলে সাহিত্য পাঠ অনেক সহজ হয়ে যায়।

এ ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের একটি নেতিবাচক মনোভাব দেখা যায়। অনেক অভিভাবক বাংলা বিষয়টিকে অবজ্ঞার চোখে দেখেন, যেন এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়। অথচ বাংলা ভাষার রয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস- রফিক, সালাম, বরকতসহ অসংখ্য ভাষা শহিদের আত্মত্যাগ।

বাংলা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অনীহা ক্রমে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির অবমূল্যায়ন ঘটাচ্ছে। গবেষক ও শিক্ষক সংখ্যা কমে যাচ্ছে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাহিত্যচর্চা ও ভাষার গভীরতা হারিয়ে যাচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মাতৃভাষার গবেষণা ও সংরক্ষণ বড় ধরনের সংকটে পড়বে। এরইমধ্যে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ ইংরেজি শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় মানুষ অবাক হয়ে ভাবতে পারে- এককালে এ দেশের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। অন্যদিকে মাতৃভাষা হওয়া সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে শুদ্ধ বাংলা চর্চার অভাব স্পষ্ট। দৈনন্দিন কথাবার্তা ও লেখালেখিতে অশুদ্ধ শব্দের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। ভাষার প্রতি এই অবহেলা আমাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।

তবে হতাশাজনক হলেও সত্য, আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণার সুযোগ এখনও পর্যাপ্ত নয়। অনেক শিক্ষার্থীর আগ্রহ থাকলেও প্রয়োজনীয় সুযোগ ও পরিবেশের অভাবে সেই আগ্রহ অনেক সময় দমে যায়। উচ্চশিক্ষায় বাংলা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অনীহা শুধু শিক্ষাগত সমস্যা নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক সমৃদ্ধির প্রশ্ন। তাই আধুনিক ও আকর্ষণীয় শিক্ষাপদ্ধতি, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রের প্রসার এবং সামাজিক সচেতনতা জোরদারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনা জরুরি। মাতৃভাষার সংরক্ষণ ও বিকাশই একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি।

মো. আমিনুর রহমান

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়