শিক্ষা এবং স্বশিক্ষা : বিভাজন নয়, সমন্বয় প্রয়োজন
মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মানুষের জীবন গঠনে শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী, সচেতন ও মানবিক করে তোলে। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষা বলতে সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা সনদকেই বোঝানো হয়। তাই শিক্ষা হয়ে পড়েছে চাকরিমুখী। চাকরির সুযোগ না থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের হার ১০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে বরং অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। জানার জন্য নয়, বরং ফল লাভের উদ্দেশেই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় নিমজ্জিত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থী। আর স্বশিক্ষা মানুষকে ভাবায়, মুক্ত চিন্তা করতে সাহায্য করে, মানবিক হিসেবে গড়ে তোলে, নীতি নৈতিকতা বোধ জাগ্রত করে এবং মানুষ করে তোলে। স্বশিক্ষা অর্জিত হয় নিজের আগ্রহ, অনুসন্ধান ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। স্বশিক্ষার মধ্যে শিক্ষা আছে, কিন্তু শিক্ষার মধ্যে স্বশিক্ষা নেই। তাই বলা যায়, বাড়ছে জনসংখ্যা, কমছে মানুষ।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের বুদ্ধিবিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় মানুষকে নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দেয়। এর ফলে ব্যক্তি সমাজ, বিজ্ঞান, ইতিহাস কিংবা সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি সংগঠিত ধারণা লাভ করে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একজন মানুষকে পেশাগত দক্ষতা অর্জনেও সহায়তা করে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতো পেশায় কাজ করতে হলে সুনির্দিষ্ট শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। তাই সমাজ গঠনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মুক্ত চিন্তার বিকাশে বাঁধা সৃষ্টি করে। কেননা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অনেকটা বাধ্য হয়েই পড়ে ছেলে-মেয়েরা। বাধ্য হয়ে পড়ার কারণ- সামাজিক স্বীকৃতি, ভবিষ্যৎ সুফল লাভ বা ভালো পেশাজীবন গঠন ও সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য। এর বাহিরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে আর কিছু দিতে পারে না। দিতে পারলেও মানুষ তা গ্রহণ করতে চায় না বা করে না।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা গুলো হলো- আমাদের পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে জ্ঞানের চেয়ে জিপিএ বা সনদের গুরুত্ব বেশি। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীরা সুস্থ প্রতিযোগিতার বদলে শুধু একটি ভালো চাকরির আশায় পড়াশোনা করে, যার ফলে তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও অজানাকে জানার স্বাভাবিক কৌতূহল মরে যায়। এছাড়া, পাঠ্যক্রমে নৈতিক মূল্যবোধ ও বাস্তবমুখী শিক্ষার অভাব, গবেষণাধর্মী চিন্তার সুযোগ সীমিত থাকা এবং পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনাকে আনন্দ হিসেবে না দেখে একটি বোঝা হিসেবে গণ্য করে। মূলত, শিক্ষার লক্ষ্য যখন শুধু ডিগ্রি অর্জন হয় এবং সেখানে সমালোচনামূলক চিন্তার (Critical Thinking) চর্চা না, তখনই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যক্তিমানসে কোনো দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়।
শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হয়ে ওঠে না। আমাদের সমাজে এমন অনেক উদাহরণ দেখা যায় যেখানে উচ্চ ডিগ্রিধারী ব্যক্তিরা নৈতিকতা, মানবিকতা কিংবা বাস্তব জ্ঞানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে। আজ পত্রিকা খুললে দেখতে পাই শিক্ষিত সমাজের বিভৎস রূপ। মানবিক অবক্ষয়, ধর্ষণ, খুন, অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রভৃতিতে লক্ষ্য করলে দেখা যায় অধিকাংশই শিক্ষিত মানুষদের সম্পৃক্ততা। যেমন বলা যায়, ফাহাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত ২৫ জনই ছিল বুয়েটিয়ান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ হত্যাকাণ্ডে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষার্থী জড়িত ছিল। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (BSAF) একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের প্রথম তিন মাসেই অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষক বা স্কুল কর্মীদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যা শিক্ষিত মানুষদের মানবিক বিপর্যয়কে স্পষ্ট ইঙ্গিত করে। এখানেই প্রশ্ন থেকে যায়, তাদের কী আমরা শিক্ষিত বলব?
এখানেই স্বশিক্ষার গুরুত্ব সামনে আসে। স্বশিক্ষা হলো নিজের কৌতূহল, অনুসন্ধান ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া। এটি মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায় এবং নতুন কিছু জানার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে। প্রকৃত মানুষ গড়ে তোলে। ইতিহাসে এমন বহু ব্যক্তিত্বের উদাহরণ রয়েছে যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকেও স্বশিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞানের উচ্চতায় পৌঁছেছেন। যার মধ্যে অন্যতম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভাঁড় ছিল শূন্য। স্বশিক্ষা মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলে। একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
বর্তমান যুগে স্বশিক্ষার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। প্রযুক্তির বিকাশের ফলে তথ্য ও জ্ঞান এখন হাতের নাগালে। বই, গবেষণা, অনলাইন শিক্ষা এবং বিভিন্ন জ্ঞানভিত্তিক মাধ্যমের মাধ্যমে মানুষ নিজ উদ্যোগেই অনেক কিছু শিখতে পারে। ফলে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর নির্ভর করলে চলবে না; নিজেকে সমৃদ্ধ করতে স্বশিক্ষার চর্চা অপরিহার্য। তবে শিক্ষা ও স্বশিক্ষাকে একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এই দুটি একে অন্যের পরিপূরক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানের ভিত্তি প্রদান করে, আর স্বশিক্ষা সেই জ্ঞানকে গভীর ও বিস্তৃত করে। যদি শিক্ষার সঙ্গে স্বশিক্ষার সমন্বয় ঘটে, তাহলে একজন ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে জ্ঞানী ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা ও স্বশিক্ষা একে অন্যের পরিপূরক, তবে জীবনের পূর্ণতার জন্য স্বশিক্ষাই বেশি অপরিহার্য। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একটি ডিগ্রি, কারিগরি দক্ষতা এবং জীবিকা নির্বাহের পথ দেখায়, যা আধুনিক সমাজে টিকে থাকার জন্য জরুরি। অন্যদিকে, স্বশিক্ষা মানুষের ভিতর বিবেক, নৈতিকতা এবং সঠিক-ভুল বিচারের ক্ষমতা তৈরি করে, যা শুধু পাঠ্যবই পড়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।
মো. আমিনুর রহমান
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
