নিরাপদ ও স্বস্তির ঈদযাত্রা আগাম প্রস্তুতি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতিতে উৎসবের আনন্দ মানেই নাড়ির টানে শেকড়ে ফেরা। ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলো থেকে লাখ লাখ মানুষ গ্রামমুখী হন। এই জনস্রোত যেমন আনন্দের বারতা বয়ে আনে, তেমনি সঠিক ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতির অভাবে তা অনেক সময় চরম ভোগান্তি, এমনকি বিষাদেও রূপ নেয়। ঈদযাত্রাকে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে শুধু মৌসুমি তৎপরতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সকল অংশীজনের সমন্বিত আগাম প্রস্তুতি।
প্রতিটি ঈদের আগে আমরা দেখি সড়ক, রেল ও নৌপথে জনস্রোতের উপচেপড়া ভিড়। গণপরিবহনের অপ্রতুলতা এবং বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে একদল অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দৌরাত্ম্য এবং মহাসড়কে যানজট ঈদযাত্রার নিয়মিত অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রেলের টিকিট সংগ্রহ থেকে শুরু করে সদরঘাট বা বাস টার্মিনালগুলোর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের ঈদ আনন্দকে ম্লান করে দেয়। একটি সুশৃঙ্খল ঈদযাত্রার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অন্তত মাসখানেক আগে থেকেই মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
বর্ষা বা অতিবৃষ্টির কারণে মহাসড়কে যেসব খানাখন্দ সৃষ্টি হয়, তা ঈদের অন্তত ১৫ দিন আগে সংস্কার করা জরুরি। শেষ মুহূর্তে জোড়াতালির কাজ অনেক সময় যানজটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যাত্রীদের চাপ সামলাতে বিআরটিসি ও রেলওয়ের বিশেষ সার্ভিস বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের পরিবহনগুলোর সঠিক তদারকি প্রয়োজন। ডিজিটাল যুগে টিকিট কেনা সহজ হলেও অনলাইন সার্ভারের সক্ষমতা বাড়ানো এবং কালোবাজারি রুখতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা আবশ্যক।
সড়ক দুর্ঘটনা ঈদযাত্রার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। ফিটনেসবিহীন বাস এবং অদক্ষ চালকদের কারণে প্রতি বছরই শত শত প্রাণ ঝরে যায়। হাইওয়ে পুলিশ ও বিআরটিএ-এর কঠোর অবস্থান এখানে সবচেয়ে বেশি জরুরি। মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে হবে। পাশাপাশি উল্টো পথে গাড়ি চালানো বা যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
নৌপথে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের ফলে লঞ্চ দুর্ঘটনা একটি নিয়মিত আশঙ্কায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া থাকলে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। নৌ-পুলিশ ও কোস্ট গার্ডকে ঘাটে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো লঞ্চই জীবন ঝুঁকিতে ফেলে অতিরিক্ত যাত্রী না নেয়। অন্যদিকে, রেলপথে সময়সূচি বিপর্যয় রোধ করা এবং ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা একান্ত প্রয়োজন।
শহর থেকে বের হওয়ার পথগুলো এবং বড় বড় ফেরিঘাটগুলো ঈদযাত্রার মূল ‘বটলনেক’ বা জটলা পাকানোর জায়গা। এসব পয়েন্টে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় উপস্থিতি প্রয়োজন। এছাড়াও, মহাসড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে যানজটের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
সরকারের একক প্রচেষ্টায় একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ঈদযাত্রা নিরাপদ করা অসম্ভব, যদি না যাত্রীরা সচেতন হন। ট্রেনের ছাদে ওঠা, চলন্ত বাসে ঝুলে থাকা কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল নদীতে ছোট নৌকায় পার হওয়া পরিহার করতে হবে। সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি- এই বোধটি প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে থাকা জরুরি।
ঈদযাত্রা শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি কোটি মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার মিলনমেলা। এই মিলনমেলা যেন রক্তক্ষয়ী না হয়, সে দায়িত্ব আমাদের সবার। আগাম পরিকল্পনা, ত্রুটিমুক্ত অবকাঠামো, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং জনগণের সচেতনতা নিশ্চিত করতে পারলে একটি স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা উপহার দেওয়া সম্ভব। সংশ্লিষ্ট শুধু মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে কাজের সমন্বয় থাকলে আমরা একটি আনন্দময় ও নিরাপদ ঈদ উৎসবের প্রত্যাশা করতে পারি।
