রমজানের শিক্ষা হোক সারা বছরের প্রেরণা
মো. শাহরিয়ার সৌরভ
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
দীর্ঘ একটি মাস রোজা পালনে শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয় না এর রয়েছে নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষাও। মানুষের আত্নাকে শুদ্ধ করার যে বীজ পবিত্র রমজান মাসে মানুষের অন্তরে রোপিত হয় সেই বীজকে পরম মমতা ভরে যত্ন করে বিশাল মহীরুহতে পরিণত করা প্রয়োজন। তাহলে মনে হবে একটি মাস রোজা রাখা আমাদের জন্য সার্থক। পবিত্র রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আল্লাহভীতির এক অনন্য সময়। এই মাসে রোজা পালনের মাধ্যমে মানুষ মাত্র ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করাই শেখে না বরং নিজের ভেতরের দুর্বলতা, লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, কামভাব ও অন্যায় প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তিও অর্জন করে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.?) বলেছেন, ‘রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখে, সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে।’ (বুখারি ও মুসলিম)। ?সর্বোপরি রোজা রাখার মাধ্যমে দৈহিক, মানসিক ও আতিœক প্রশান্তি অর্জিত হয়ে থাকে। রমজানকে শুধু একটি মাসের ইবাদতের সময় হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য ধরা পড়ে না। এই মাসের শিক্ষা হওয়া উচিত সারা বছরের জীবনচলার প্রেরণা। রমজান থেকে সবচেয়ে বড় যেই শিক্ষাটি পেয়ে থাকি তা হলো সংযম বা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। সারাদিন ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করে একজন মানুষ নিজের নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। উপবাসের ক্ষুধা যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়- প্রতি মুহূর্তেই কেউ না কেউ অভাবের শিকলে বেঁধে আছে। এই সংযম যদি শুধু রমজানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তবে তার পূর্ণ ফল পাওয়া যায় না। বছরের প্রতিটি দিনেই যদি আমরা ভোগ-বিলাস, স্বেচ্ছাচারিতা ও আচরণে সংযমের অনুশীলন করি তাহলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই উপকৃত হবে। রমজান আমাদের সহমর্মিতা ও মানবিকতারও সুষ্ঠু পাঠ প্রদান করে। যখন একজন মানুষ নিজে ক্ষুধা অনুভব করে তখন সে হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষের কষ্ট আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে। ফলে দান-সদকা ও জাকাত দেওয়ার মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতার চর্চা বাড়ে। ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল। আর রমজানে তিনি আরও বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন।’
(বুখারি ও মুসলিম) কিন্তু রমজান শেষ হলো আর আমরা এই মানবিকতার শিক্ষা ভুলে গেলাম তাহলে তো রমজানের প্রকৃত শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যাবে। আমাদের সমাজের গরীব ও মিসকিন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যের কষ্টে সাড়া দেওয়া- এসব গুণ সারা বছর ধরে লালন করা প্রয়োজন। আবার রমজানে আত্মশুদ্ধির ও নিয়মানুবির্ততার এক বড় সুযোগ রয়েছে। এই মাসে মানুষ বেশি করে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও ইবাদতে মনোনিবেশ করে। প্রতিদিনের ধারাবাহিক ইবাদত ও সঠিক সময়ের মধ্য দিয়ে খাদ্যগ্রহণ ও নামাজের মাধ্যমে ব্যক্তি জীবনে শৃঙ্খলা গড়ে ওঠে। অনেক মানুষ তাদের বদ অভ্যাস ত্যাগের চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে রমজান শেষ হলেই অনেকের সেই পরিবর্তন ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে রমজানে অর্জিত আদর্শ খণ্ডিত হয়ে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় তা হলো রমজানে ইবাদতের যে অভ্যাস গড়ে ওঠে তা বছরের বাকিটা সময় আগলে রাখা দরকার। ইবাদতের পাশাপাশি অন্যান্য নেক আমলও সারা বছর চালু রাখা। রমজানের শিক্ষা হোক সারা বছরের প্রেরণা- এই চেতনা ধরে রাখতে মিথ্যা, গীবত, কপটতা, ধোঁকাবাজি এবং অন্যায় আচরণ থেকে সারা বছর দূরে থাকার শপথগ্রহণ করা উচিত। রমজান মাসে যেমন রোজা ভঙ্গের ভয়ে হারামণ্ডহালাল বেছে চলেছি, রাগ পরিহার ও মিথ্যা পরিত্যাগ করে চলেছি তেমন বছরের প্রতিক্ষণেও তা বজায় রাখি। রোজার মাসে যেমন দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের হাজিরা বেড়ে যায় সেই চোখের শান্তিময় দৃশ্য বছরের বাকি দিনেও যাতে দেখা যায়। মাহে রমজান মুসলিম উম্মাহকে যে প্রশিক্ষণ দেয় তা পরবর্তী জীবনের সবক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হওয়াই এর প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। রমজানের শীতল সমৃদ্ধ হাওয়া বয়ে যাক বছরের প্রতিটি দিনের প্রতিটি সময়ে।
মো. শাহরিয়ার সৌরভ
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
