মধ্যবিত্তের অন্তহীন জীবন সংগ্রাম
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মধ্যবিত্ত জীবন মানেই এক অদ্ভুত দ্বৈতাচারী অস্তিত্ব, যেখানে আভিজাত্য বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা আর শূন্য পকেটের হাহাকার প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে। সমাজের এই স্তরটি না পারে নিচুতলার মানুষের মতো হাত পাততে, না পারে উচ্চবিত্তের মতো দুশ্চিন্তাহীন বিলাসিতায় ভাসতে। প্রতিদিনের সূর্যোদয় এদের কাছে নতুন এক ফর্দ নিয়ে হাজির হয়- বাড়ি ভাড়া, সন্তানের স্কুলের বেতন, বিদ্যুৎ বিল আর বাজারের ফর্দ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে মধ্যবিত্তের জীবন আজ যেন তাসের ঘরের মতো নড়বড়ে। বাজারে গিয়ে ব্যাগের আকার ছোট হতে হতে আজ তা তলানিতে ঠেকেছে, অথচ লোকলজ্জার ভয়ে তারা মুখ ফুটে বলতে পারে না যে তাদের সামর্থ্য ফুরিয়ে আসছে। একটি শার্ট বছরের পর বছর ইস্ত্রি করে পরে যাওয়া কিংবা ছেঁড়া জুতা পালিশ করে নতুনের মতো দেখানোর আড়ালে যে দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে থাকে, তার খবর রাখে না কেউ। উৎসব-পার্বণ এলে মধ্যবিত্ত বাবার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে; সন্তানের নতুন জামা আর স্ত্রীর আবদার মেটাতে গিয়ে নিজের প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা বা পুরনো চশমাটা বদলে নেওয়ার কথা তিনি অনায়াসেই ভুলে যান।
শিক্ষিত এই শ্রেণিটিই সমাজের মেরুদণ্ড, অথচ এই মেরুদণ্ড আজ ঋণের বোঝায় ন্যুব্জ। মাস শেষে বেতনের টাকাটা ব্যাংকে ঢোকার আগেই তা ভাগ হয়ে যায় ডজনখানেক পাওনাদারের তালিকায়। আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করা থেকে শুরু করে সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান- সবখানেই এক কৃত্রিম হাসি মুখে মেখে তাদের উপস্থিত হতে হয়।
মধ্যবিত্তের ডাইনিং টেবিলের মেনু বদলে যায় বাজারের দরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে; মাছের বদলে ডিম আর মাংসের বদলে সবজিই যখন স্থায়ী জায়গা করে নেয়, তখন মা বা গৃহকর্ত্রী নিপুণ দক্ষতায় তা পরিবেশন করেন যেন কারোর মনে কোনো আক্ষেপ না থাকে। অসুস্থতা এদের কাছে এক চরম অভিশাপের নাম, কারণ বড় কোনো চিকিৎসা মানেই তিল তিল করে জমানো সঞ্চয়টুকু নিমেষেই শেষ হয়ে যাওয়া।
তবুও দিনশেষে মধ্যবিত্ত স্বপ্ন দেখে- সন্তান একদিন বড় হবে, অভাবের এই শিকল ভাঙবে। এই আশাই তাদের ক্লান্ত শরীর নিয়ে পরের দিন আবার কাজে যাওয়ার শক্তি জোগায়। মধ্যবিত্তের জীবন আসলে এক অমীমাংসিত সমীকরণ, যেখানে প্রাপ্তির চেয়ে বিসর্জনের পাল্লা সবসময়ই ভারী থাকে।
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
