শয়তান বন্দি থাকলেও কেন রমজানে পাপ হয়

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শয়তান বন্দি থাকলেও কেন রমজানে পাপ হয়- এটি একটি গভীর তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক জিজ্ঞাসা। পবিত্র রমজান মাসে যখন অশুভের মূল উৎস শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, তখনও মানুষের চরিত্রে কালিমার উপস্থিতি আমাদের নিজস্ব অস্তিত্বের জটিলতাকে সামনে আনে। এই নিবন্ধে আমরা এই রহস্যের উন্মোচন করার চেষ্টা করব।

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য এক পবিত্র আধ্যাত্মিক বসন্ত। হাদিস অনুযায়ী, এ মাসে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে বন্দি করা হয়। কিন্তু তবুও সমাজে মিথ্যা, গিবত বা লালসার মতো পঙ্কিলতা দৃশ্যমান থাকে। এর মূল কারণ হলো মানুষের সঞ্চিত কুপ্রবৃত্তি বা ‘নফস’। শয়তান শুধু প্ররোচনা দেয়; কিন্তু কর্মের বীজটি বপন করা থাকে মানুষের মনের গহিনে। যখন বাইরের উস্কানি থেমে যায়, তখনও মনের ভেতরের জমানো ময়লাগুলো আপন গতিতে সক্রিয় থাকে। এটি ঠিক সেই প্রদীপের মতো, যার তেল ফুরিয়ে গেলেও পলতেটি কিছুক্ষণ জ্বলতে থাকে। কবি আল্লামা ইকবালের ভাষায়- ‘তুঝে কিয়া মিলেগা ইবাদত মেঁ, আগার দিল তেরা হ্যায় নাপাক; সাজদোঁ সে জান্নাত নহী মিলতী, নেক আমল হি হ্যায় নাজাত কা রাস্তা।’ অর্থাৎ, তোমার ইবাদতে কী লাভ হবে যদি হৃদয় অপবিত্র থাকে? শুধু সেজদায় জান্নাত মেলে না, বরং সৎকর্মই মুক্তির পথ।

চিকিৎসা বিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের প্রতিটি কাজ মস্তিষ্কে একটি নির্দিষ্ট ‘নিউরোলজিকাল পাথওয়ে’ তৈরি করে। যখন আমরা বছরের বাকি ১১ মাস কোনো পাপ বা খারাপ কাজে লিপ্ত থাকি, তখন মস্তিষ্কের ডোপামিন হরমোন সেই কাজের প্রতি আমাদের আসক্ত করে তোলে। রমজানে শয়তান বন্দি থাকলেও মস্তিষ্কের সেই পুরোনো সার্কিটগুলো সক্রিয় থাকে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘নিউরাল প্লাস্টিসিটি’ বলা হয়। রমজান মাসে দীর্ঘদিনের লালিত বদভ্যাসগুলো শয়তানি প্ররোচনা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়। এটি যেন একটি চলন্ত ফ্যান, যার সুইচ বন্ধ করার পরেও জড়তার কারণে পাখাগুলো কিছুক্ষণ ঘুরতে থাকে।

ইসলামী তত্ত্বে ‘নফস’ বা রিপু হলো মানুষের অভ্যন্তরীণ শত্রু। শয়তান বাইরে থেকে ধোঁকা দেয়, কিন্তু নফস আমাদের ভেতরেই থাকে। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের মধ্যে কিছু আদিম প্রবৃত্তি থাকে, যা টিকে থাকার লড়াই এবং বংশবিস্তারের সঙ্গে জড়িত। এই প্রবৃত্তিগুলো যখন লাগামহীন হয়ে পড়ে, তখনই পাপের জন্ম হয়। শয়তান বন্দি থাকলেও মানুষের ডিএনএ-তে থাকা কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহের মতো জৈবিক তাড়নাগুলো স্তিমিত হয় না। তাই আত্মশুদ্ধির অভাব থাকলে শয়তানহীন পরিবেশেও মানুষ নিজের জৈবিক চাহিদার কাছে পরাজিত হয়ে পাপে লিপ্ত হয়।

মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, মানুষের মনের একটি বিশাল অংশ হলো- ‘BW’, যা শুধু তাৎক্ষণিক আনন্দ চায়। রমজান মাসে শয়তান বন্দি থাকলেও আমাদের অবচেতন মনে জমে থাকা দীর্ঘদিনের অন্ধকার বাসনাগুলো বিলীন হয় না। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কন্ডিশনিং’ বলা হয়। আমরা যদি বছরের অন্য সময়ে নেতিবাচক চিন্তায় অভ্যস্ত থাকি, তবে রমজানে পরিবেশ অনুকূল থাকলেও আমাদের মন সেই পুরোনো ছক অনুযায়ী চিন্তা করতে থাকে। এখানে অপরাধবোধ বা চারিত্রিক বিচ্যুতি শুধু বাহ্যিক শক্তির প্রভাবে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ মানসিক কাঠামোর দুর্বলতার কারণে ঘটে।

সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের আচরণ তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। যদিও শয়তান বন্দি থাকে; কিন্তু সমাজ কাঠামোর ভেতরে থাকা দুর্নীতিলব্ধ ব্যবস্থা, অশ্লীল বিজ্ঞাপন এবং অসৎ সঙ্গের প্রভাব বিদ্যমান থাকে। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের তত্ত্ব অনুযায়ী, সামাজিক সংহতি নষ্ট হলে মানুষের নৈতিক বিচ্যুতি ঘটে। রমজানে যখন আমরা বিপথগামী সঙ্গীদের সঙ্গে মিশি বা অশ্লীল পরিবেশের সংস্পর্শে থাকি, তখন সেই পরিবেশগত চাপ আমাদের অবচেতনেই পাপে নিমজ্জিত করে। পরিবেশের এই নেতিবাচক শক্তি শয়তানের অনুপস্থিতিতেও প্ররোচকের ভূমিকা পালন করে।

রসায়ন বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আমরা যা খাই তার প্রভাব আমাদের হরমোন এবং মেজাজের ওপর পড়ে।

হারাম বা অবৈধ উপার্জনের খাদ্য শরীরে যে পুষ্টি সরবরাহ করে, তা মানুষের চিন্তাধারায় নেতিবাচক রাসায়নিক পরিবর্তন আনে। ‘গ্লুটামেট’ এবং ‘গাবা’ হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা ও পাপাচারের প্রবণতা বাড়ে। রমজানে যদি ইফতার ও সেহরিতে হারাম খাবার থাকে, তবে সেই খাদ্যের জৈব-রাসায়নিক প্রভাব মানুষের আত্মাকে কলুষিত করে রাখে। ফলে শয়তান বন্দি থাকলেও রক্তে মিশে থাকা সেই অপবিত্র প্রভাব ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটায় ও পাপে উৎসাহিত করে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল