সংযমের শিক্ষা বনাম বাজারের অসংযম
তাসনিয়া তাবাচ্ছুম
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
রমজান বিশ্বের সয মুসলমানের জন্য একটি পবিত্র মাস। রমজান মুসলিম বিশ্বের কাছে শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম ও সহমর্মিতার এক অনন্য শিক্ষা বহন করে। সারাদিন না খেয়ে থাকার মাধ্যমে মানুষ নিজের চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে এবং সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করার সুযোগ পায়। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী এই মাসে দয়া, উদারতা ও মানবিকতার চর্চা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন, রমজান মাস এলেই আমাদের দেশের বাজারে প্রায়ই দেখা যায় এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।
প্রতিবছর রমজান মাস আসার সঙ্গে সঙ্গেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজসহ ইফতারের বিভিন্ন উপকরণ- সবকিছুর দাম হঠাৎ করে বাড়তে থাকে। অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তেমন কোনো পরিবর্তন না থাকলেও দেশের বাজারে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের রমজানে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডালের দাম গড়ে ২৫% বৃদ্ধি পায়, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেনি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে বড় কারণ হচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট, যারা মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করে। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের উপর পড়ে এর বড় চাপ।
এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ। দিনমজুর, শ্রমিক বা সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য রমজানের বাজার করা অনেক সময় কষ্টকর হয়ে ওঠে। প্রতিদিন ইফতার ও সাহরির জন্য প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করতে গিয়ে তাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। অনেক পরিবারকে তখন প্রয়োজন কমিয়ে এনে কিংবা বিকল্প খাবার দিয়ে ইফতার এবং সাহরি সম্পন্ন করতে হয়। যে মাস মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও দয়ার বার্তা বহন করে, সেই মাসেই সাধারণ মানুষের উপর চাপ ও কষ্ট বৃদ্ধি পাওয়া সমাজের জন্য এক গভীর বৈপরীত্যের চিত্র।
বাংলাদেশের বাজারে সিন্ডিকেট ও অস্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা নতুন কিছু নয়। প্রায়ই অভিযোগ ওঠে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মজুতদারি করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এবং সেই সুযোগে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। রমজানের মতো মসে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কারণ এই সময় খাদ্যপণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বৃদ্ধি পায়। সেই বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে যদি অসাধু মুনাফার প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তবে তা আর শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, একটি নৈতিক সংকটও বটে।
এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাজার তদারকি, ভোক্তা অধিকার রক্ষা এবং অবৈধ মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত বাজার মনিটরিং, পর্যাপ্ত পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের রমজানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু মজুতদারকে ধরে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। ফলে কিছু পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আসে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরে।
তবে শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, ব্যবসায়ীদের মধ্যেও নৈতিক দায়বোধ থাকা প্রয়োজন। রমজান এমন একটি পবিত্র মাস, যখন মানুষের উচিত মুনাফার প্রতিযোগিতার বদলে সংযম ও মানবিকতার চর্চা করা। ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করা যেন দরিদ্র ও নিম্নবিত্তরাও একটু স্বস্তির সঙ্গে কিনতে পারে। সমাজের এসব মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারাটাই তো পবিত্র রমজান মাসের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
সবশেষে বলা যায়, রমজান আমাদের সংযম, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। এই শিক্ষা যদি কেবল ব্যক্তিগত জীবন অবধিই সীমাবদ্ধ থাকে, আর বাজারে অসংযম ও অমানবিকতার চর্চা হয়, তবে রমজান মাসের শিক্ষা পূর্ণতা পায় না। তাই রমজানের প্রকৃত তাৎপর্য তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন ব্যক্তি, সমাজ ও বাজার- সব জায়গাতেই সংযম ও নৈতিকতার চর্চা প্রতিষ্ঠিত হবে। একমাত্র তখনই এই পবিত্র মাস সত্যিকার অর্থে মানুষের জীবনে শান্তি, সাম্য ও সহমর্মিতার বার্তা বয়ে আনতে পারবে।
তাসনিয়া তাবাচ্ছুম
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ
