বিসিএস : স্বপ্নের আড়ালে এক কঠিন বাস্তবতা
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছে সরকারি চাকরি, বিশেষ করে বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস), দীর্ঘদিন ধরেই এক বিশেষ আকর্ষণের নাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জের চায়ের দোকান- সব জায়গায় বিসিএস নিয়ে আলোচনা যেন এক অনিবার্য বিষয়। এই আকর্ষণের পেছনে রয়েছে আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা পাওয়ার এক অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শুরু হওয়া বিসিএস পরীক্ষা মূলত দেশের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্যই চালু হয়েছিল। তখনকার সময়ের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সরকারি চাকরিতে বেতন তুলনামূলক কম হলেও সামাজিক সম্মান ছিল অনেক বেশি। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরাই বেশি করে বিসিএসের দিকে ঝুঁকত। ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা সাধারণত নিজেদের পেশাগত ক্ষেত্রেই ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চিত্র বদলে গেছে। বর্তমানে বিসিএস যেন ‘সোনার হরিণ’ হয়ে উঠেছে। এখন শুধু সাধারণ বিভাগ নয়, বরং ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরাও বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। এমনকি যারা নিজেদের বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন, তারাও পেশাগত ক্ষেত্র ছেড়ে বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসনে প্রবেশ করতে চাইছেন।
প্রশ্ন জাগে, কেন এই পরিবর্তন? এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে অসামঞ্জস্য। একজন শিক্ষার্থী যে বিষয়ে পড়াশোনা করেন, সেই বিষয়ে উপযুক্ত চাকরির সুযোগ দেশে অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। ফলে বাধ্য হয়েই অনেকেই বিসিএসকে একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক বিকল্প হিসেবে বেছে নেন। এটি একদিকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় হলেও অন্যদিকে এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতার দিক নির্দেশ করে। সরকারি চাকরির প্রতি আকর্ষণের আরেকটি বড় কারণ হলো- আর্থিক নিরাপত্তা। জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫ অনুযায়ী একজন নবনিযুক্ত বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা গ্রেড-৯ এ যোগদান করেন, যেখানে মূল বেতন শুরু হয় ২২ হাজার টাকা থেকে এবং ধাপে ধাপে তা ৫৩ হাজার ৬০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, উৎসব ভাতা এবং অবসরকালীন পেনশন সুবিধা। এসব সুবিধা একজন চাকরিজীবীকে একটি স্থিতিশীল জীবনের নিশ্চয়তা দেয়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে- এই বেতন কাঠামো কি বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বর্তমান বাস্তবতায়, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়, জীবনযাত্রার ব্যয় দিন দিন বেড়েই চলেছে।
বাসাভাড়া, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা- সবকিছুর খরচ বেড়ে যাওয়ায় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপেও দেখা গেছে যে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ব্যয়বহুল শহরে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন নবনিযুক্ত বিসিএস কর্মকর্তার জন্য পরিবার নিয়ে স্বচ্ছলভাবে জীবনযাপন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই আর্থিক চাপই অনেক ক্ষেত্রে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার জন্ম দেয়। যখন একজন কর্মকর্তা তার আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সমন্বয় করতে ব্যর্থ হন, তখন তার সামনে কিছু অনৈতিক পথ খুলে যেতে পারে। যদিও সবাই এই পথে হাঁটেন না, তবুও একটি অংশ দুর্নীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে- এটি অস্বীকার করার উপায় নেই।
দুর্নীতির বিষয়টি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নৈতিকতার অভাব নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত সমস্যার ফল। যখন একজন কর্মকর্তা মনে করেন যে তার বৈধ আয়ে তার প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়, তখন তিনি বিকল্প পথ খোঁজেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ক্ষমতার অপব্যবহার, সামাজিক চাপ এবং দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতির আকাঙ্ক্ষা। তবে এই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়- আমরা কি বিসিএসকে শুধুমাত্র একটি চাকরি হিসেবে দেখছি, নাকি একটি দায়িত্ব হিসেবে?
বিসিএস ক্যাডাররা দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর মেরুদণ্ড। তাদের ওপর নির্ভর করে দেশের নীতি বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনসেবার মান। যদি এই কাঠামোর ভেতরে দুর্নীতি প্রবেশ করে, তাহলে তা পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দেয়। ফলে বিসিএসের প্রতি যে সম্মান ও আস্থা সাধারণ মানুষের রয়েছে, তা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।
এখানে প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, বেতন কাঠামোকে সময়োপযোগী করা জরুরি, যাতে কর্মকর্তারা তাদের বৈধ আয়ের মাধ্যমেই একটি সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ নিজ বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়তে উৎসাহিত হন এবং পর্যাপ্ত সুযোগ পান।
এছাড়া সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে এখনও সরকারি চাকরিকে একমাত্র সফলতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। বেসরকারি খাত, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের দিকে গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, বিসিএস শুধুমাত্র একটি চাকরি নয়, এটি একটি দায়িত্ব, একটি অঙ্গীকার। যারা এই সেবায় যোগ দেন, তাদের উচিত দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সততার সঙ্গে কাজ করা। অন্যদিকে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব তাদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা সৎ থেকে কাজ করতে পারেন। বিসিএসকে যদি আমরা সত্যিকারের সম্মানজনক ও কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চাই, তাহলে আমাদের সবাইকে- রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি- নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে। তাহলেই হয়তো একদিন আমরা এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারব, যেখানে স্বপ্ন, সততা এবং সেবার সমন্বয় ঘটবে।
ওরাইনা খাঁন চৌধুরী
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
