ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সেকাল এবং একালের শৈশবের ঈদের রঙিন দিনগুলো

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
সেকাল এবং একালের শৈশবের ঈদের রঙিন দিনগুলো

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে ঈদ এক পশলা আনন্দের বৃষ্টি। তবে এই আনন্দের স্বাদ কালভেদে ভিন্ন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মানুষের কাছে ঈদ মানেই এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা, নতুন পোশাকের ঘ্রাণ আর সেমাই-চিনির মিষ্টতা। যাদের বয়স আজ ৩৫-এর কোঠায়, তাদের শৈশবের ঈদ আর আজকের ‘ডিজিটাল’ প্রজন্মের ঈদের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত। কবি আল মাহমুদের ভাষায়, ‘পড়ল মনে শৈশব সেই ঈদের দিনের ছবি/মাঠের কোণে বাজছে কাঁসর, উঠছে নতুন রবি।’ সেকালের সেই ধুলোমাখা মেঠো পথের ঈদ আর একালের যান্ত্রিকতা ঘেরা ঈদের মেলবন্ধনই এই নিবন্ধের উপজীব্য।

সেকালে চাঁদ দেখা ছিল এক মহোৎসব। রেডিওর নব ঘুরিয়ে বা মসজিদের মিনার থেকে ঘোষণা শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকা। পশ্চিম আকাশে এক ফালি বাঁকা চাঁদ দেখা গেলেই পাড়ায় পাড়ায় শুরু হতো শোরগোল। ঈদের জামা আগেভাগে কাউকে দেখানোর নিয়ম ছিল না। আলমারির কোণে বা ট্রাঙ্কের নিচে লুকিয়ে রাখা সেই পোশাক ঈদের দিন সকালেই প্রথম জনসমক্ষে আসতো।

সেই সুতির জামার নতুন গন্ধ আজও ৩৫ ঊর্ধ্বদের নস্টালজিক করে। আজকের মতো বাজারে কেনা টিউব মেহেদি তখন সহজলভ্য ছিল না। গাছ থেকে পাতা ছিঁড়ে পাটায় বেটে হাতে লাগানো হতো। হাতের তালুতে সেই লালচে আভা ছিল পরম প্রাপ্তি। অনেকে আবার নখের ডগায় আলতা দিয়ে রাঙাতেন। সাতসকালে পুকুরে ডুব দিয়ে নতুন পাঞ্জাবি পরে বাবার হাত ধরে ঈদগাহে যাওয়া ছিল বীরত্বের কাজ। নামাজের পর শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে বুক মেলানো বা কোলাকুলি ছিল সম্প্রীতির এক মূর্ত প্রতীক। ঈদের আসল আনন্দ ছিল সেলামি। ৫ টাকা বা ১০ টাকার সেই নতুন কড়কড়ে নোটের জন্য বড়দের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার প্রতিযোগিতা চলত। সেই সামান্য টাকা দিয়ে কী কেনা হবে, তার পরিকল্পনা চলত মাসজুড়ে।

আজকের মতো রেস্টুরেন্টের খাবারের চল ছিল না। ঘরে তৈরি হাতে কাটা সেমাই, দুধ-পায়েস আর ফিরনির গন্ধে ম ম করত বাড়ি। মা-চাচিদের সেই হাতের জাদু ছাড়া ঈদ ছিল অপূর্ণ। দল বেঁধে এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যাওয়া ছিল সেকালের প্রথা। চেনা-অচেনা সব বাড়িতেই ছিল অবারিত দ্বার। মিষ্টিমুখ না করে কেউ ফিরতে পারত না। এতে সামাজিক বন্ধন হতো সুদৃঢ়।

গ্রাম বা মফস্বলের ঈদ মানেই ছিল মেলা। মাটির পুতুল, টিনের চড়কি, বাঁশি আর কাঠের ঘোড়া কেনাই ছিল শিশুদের একমাত্র লক্ষ্য। মেলা থেকে কেনা সেই সস্তা বাঁশির সুর আজও কানে বাজে অনেকের। ইন্টারনেটের যুগে ঈদ কার্ড হারিয়ে গেছে। তখন মাসখানেক আগে থেকেই রঙিন কার্ড কিনে বন্ধুদের পাঠানো হতো। হাতে লেখা ‘ঈদ মোবারক’ ছিল গভীর আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশে বিটিভির ‘আনন্দমেলা’ বা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামবাংলার যাত্রা-গান ছিল বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু। ড্রয়িংরুমে ঠাসাঠাসি করে বসে সবাই মিলে অনুষ্ঠান দেখার সেই আনন্দ এখনকার ওটিটি প্ল্যাটফর্মে পাওয়া অসম্ভব।

একালে এখন আর পশ্চিম আকাশে তাকিয়ে থাকতে হয় না। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বা ফেসবুকের নোটিফিকেশনে মুহূর্তেই পৌঁছে যায় চাঁদ দেখার খবর। শিশুদের কাছে এটি এখন শুধুই একটি তথ্য, কোনো রোমাঞ্চ নয়। এখন পোশাক কেনা হয় এসি মার্কেটে বা অনলাইনে। লুকানোর বালাই নেই, বরং কেনা মাত্রই তার ছবি চলে যায় ইনস্টাগ্রামে। শিশুদের কাছে নতুন পোশাক এখন আর ‘দুম্প্রাপ্য’ কিছু নয়, বরং একটি নিয়মিত ব্যাপার। ঈদ কার্ডের জায়গা নিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার স্টিকার। শিশুরা এখন বন্ধুদের সঙ্গে খেলার চেয়ে ভিডিও গেম বা টিকটক ভিডিও তৈরিতে বেশি আগ্রহী। সামাজিক যোগাযোগটাই এখন অনেকটা যান্ত্রিক। ঘরের সেমাই-পায়েসের চেয়ে এখনকার শিশুদের পছন্দ পিৎজা, বার্গার বা দামি ক্যাফেতে ডিনার। ঈদের রান্না এখন মায়ের হাতের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ফুড ডেলিভারি অ্যাপের ওপর নির্ভরশীল। সেলামির অঙ্ক এখন শত থেকে হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। শিশুরা এখন কড়কড়ে নোটের চেয়ে ভাবে ওই টাকায় কতো ভালো গেম কেনা যাবে বা ফোনের ব্যালেন্স রিচার্জ করা যাবে। আগে ছিল যৌথ পরিবারের ভিড়, এখনকার শিশুরা ফ্ল্যাটবন্দি জীবনে অভ্যস্ত। আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়ার চেয়ে ঘরে এসি চালিয়ে মোবাইল চালানোই তাদের কাছে বেশি আরামদায়ক। ফলে সামাজিক শিক্ষার অভাব থেকে যাচ্ছে। পাড়ার মেলা এখন শিশুদের টানে না। ঈদ মানেই এখন কোনো থিম পার্ক বা রিসোর্টে গিয়ে সময় কাটানো। প্রকৃতির চেয়ে কৃত্রিম বিনোদনেই আজকের শৈশব বন্দি।

শৈশবের ঈদে সবার যখন নতুন পোশাকের নেশা, আমার তখন একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান ছিল একটি ফুটবল। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বড় ভাইয়ের কাছে বায়না ধরে পাওয়া সেই ‘ডিয়ার ফুটবল’ ছিল আমার ঈদের শ্রেষ্ঠ উপহার। কিন্তু আনন্দের সেই মুহূর্ত বিষাদে রূপ নেয় যখন বলটি প্রথম আঘাতেই কাঁটা গাছে বিদ্ধ হয়ে ফেটে যায়। বল হারানোর সেই শোকে আমার কান্না থামছিল না, যা দেখে পুরো বাড়ির উৎসবের আমেজ ফিকে হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির সবার আদরের হওয়ায় আমার মন খারাপের ছায়া পড়েছিল সবার মনে। একটি সাধারণ ফুটবলকে কেন্দ্র করে সেই ঈদটি আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে। ঈদের দিনে টাকার হিসাব বা সেলামি জমানোর দিকে আপনার কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না। আমার সব পরিকল্পনা থাকত ঈদ-পরবর্তী খেলাধুলা আর বন্ধুদের নিয়ে নানা কর্মসূচি সাজানো নিয়ে। টাকা-পয়সার প্রতি এই উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে প্রায়ই আমার পকেট থেকে টাকা চুরি হয়ে যেত। ছেলের পকেট খালি হওয়া ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত মা নিজেই আমার পকেট থেকে টাকা সরিয়ে রাখতেন। সারাদিন টাকা হারানো নিয়ে দুশ্চিন্তামুক্ত থাকলেও দিনশেষে মা যখন সব টাকা ফেরত দিতেন, তখন এক অদ্ভুত স্বস্তি কাজ করত। মায়ের সেই সচেতনতা আর আমার উদাসীনতা আজও ঈদের এক মধুর স্মৃতি।

ঈদের আনন্দের মধ্যেও পড়াশোনার বিষয়ে আমার বাবা ছিলেন আপসহীন এক কড়া শিক্ষক। শীতকালের ঈদেও রেহাই মিলত না; খোলা আকাশের নিচে মাদুর বিছিয়ে তিনি আমাকে নিয়ে পড়তে বসতেন। বাবার এই কঠোরতা দেখে বন্ধুবান্ধব ও বড় ভাইবোনেরা বেশ বিরক্ত ও রাগান্বিত হতেন। বছরের শ্রেষ্ঠ উৎসবের দিনেও এমন পড়াশোনার দৃশ্য ছিল গ্রামবাসীর কাছে এক বিরল ও হাস্যকর ঘটনা। আজও আমার চাচাতো বোনেরা সেই স্মৃতি মনে করে হাসাহাসি করে এবং আমার শৈশবকে ফিরে দেখে। বাবার সেই কঠোর শাসনের স্মৃতি এখন আমার জীবনের এক অমূল্য এবং আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।

এসএসসি পরীক্ষার পর অবসর সময়ে চেয়ারম্যান কাকার অনুরোধে আমি বালিয়াধর নুরুন নেচা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের,বর্তমানে সেটি নাম পরিবর্তন হয়ে আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় হয়েছে, গণিত শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করি মাত্র তিন মাসের জন্য। ঈদুল ফিতরের দিন ছাত্রীদের বাড়িতে দাওয়াত খেতে গিয়ে আমাকে এক অদ্ভুত ও মজার পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। অনেক মুরুব্বি আমাকে দেখে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে এত অল্প বয়সী কেউ স্কুলের শিক্ষক হতে পারে। ছাত্রীদের কাছে ‘স্যার’ হিসেবে পরিচয় পাওয়ার পর মুরুব্বিদের সেই বিস্ময় আর সন্দেহ এক মজার অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করেছিল।

পরিশেষে, সময় বহমান, তাই উৎসবের রূপ বদলাবে এটাই স্বাভাবিক।

সেকালের ঈদে ছিল প্রাণের টান আর একালের ঈদে আছে চাকচিক্য। তবে আনন্দের মূল সুরটি একই- ভালোবাসা ও মিলন। ৩৫ বছর আগের সেই ধুলোমাখা শৈশব আর আজকের এই হাই-টেক শৈশবের মধ্যে সেতুবন্ধন হতে পারে পারিবারিক মূল্যবোধ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’- সেই আনন্দের ধারা যেন প্রতিটি শিশুর মনে অমলিন থাকে, তা সেকাল হোক কিংবা একাল। সালামি হোক বা স্মৃতি, ঈদ চিরকালই থাকুক শৈশবের রঙিন ক্যানভাসে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত