ঢাকা বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬, ১১ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

স্মৃতির পাতায় এবারের ঈদ

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
স্মৃতির পাতায় এবারের ঈদ

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি। তবে ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতর বিশ্ববাসীর কাছে শুধু একটি উৎসব নয়, বরং এটি ছিল সম্প্রীতি আর সংগ্রামের এক মূর্ত প্রতীক। এই ঈদ বিশ্ববাসীর সামনে এক অনন্য বারতা নিয়ে হাজির হয়েছে। একপাশে উৎসবের বর্ণিল আলোকসজ্জা, অন্যপাশে যুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত দীর্ঘশ্বাস- এই দুই বৈপরীত্যের মধ্যেই উদযাপিত হয়েছে এবারের ঈদ। ইসলামের শাশ্বত শান্তির বাণীর সঙ্গে বাস্তবের রূঢ় সত্যের যে সংঘাত, তার প্রতিচ্ছবিও দেখা গেছে এবারের ঈদে। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়- ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন্ আসমানি তাগিদ।’ এই তাগিদ কেউ পালন করেছে উৎসবের রঙে, কেউবা ধৈর্য আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে। ইসলামি সংস্কৃতির প্রাণপুরুষ আল্লামা ইকবাল বলেছিলেন, ‘মুসলিম হ্যায় হাম, ওয়াতান হ্যায় সারা জাহা হামারা’ (আমরা মুসলিম, সারা বিশ্বই আমাদের আবাস)। কবির এই বাণীর প্রতিফলন যেন দেখা গেছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম উম্মাহর বিচিত্র অনুভূতির মাঝে। এই নিবন্ধে ২০২৬ সালের ঈদের বৈশ্বিক ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে ঈদের আনন্দ-

ভারতের বিভিন্ন ঈদগাহে এবার এক অনন্য দৃশ্য দেখা গেছে। ধর্মীয় বিভেদ ভুলে ঈদ জামাতে মুসলিম ভাইদের ওপর পুষ্পবৃষ্টি করে সম্প্রীতির এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে অন্য ধর্মাবলম্বীরা। শত কষ্টের মাঝেও ফিলিস্তিনের গলিগুলোতে এবার উৎসবের আমেজ দেখা গেছে। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই শিশুরা মেতেছে ঈদের আনন্দে, যা তাদের অপরাজেয় মানসিকতার পরিচয় দেয়। পবিত্র মক্কা নগরীতে এবার রেকর্ডসংখ্যক মুসল্লির সমাগম ঘটেছে। কাবার চত্বরে সাদা ইহরাম আর শুভ্র পোশাকে বিশ্ব মুসলিমের এক হওয়ার দৃশ্য ছিল অভূতপূর্ব। ইস্তাম্বুলের নীল মসজিদে অটোমান ঐতিহ্যের ছাপ রেখে হাজার হাজার মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করেছেন, যা দেশটির সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিকেই ফুটিয়ে তুলেছে।

সিডনি ও মেলবোর্নের পার্কগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের মুসলিমরা মিলেমিশে ঈদ উদযাপন করেছেন, যা পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়েছে। আধুনিক সিঙ্গাপুরে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ঈদ পালিত হয়েছে। সেখানে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ভোজের আয়োজন ছিল প্রশংসনীয়।

জাপানের টোকিও জামে মসজিদে এবার তরুণ প্রজন্মের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রযুক্তি আর আধ্যাত্মিকতার মিশেলে জাপানি মুসলিমরা দিনটি উদযাপন করেছেন। দিল্লির জামে মসজিদে মুঘল আমলের আভিজাত্যে নামাজ আদায় শেষে মেতে উঠেছেন সাধারণ মানুষ, যা ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। পাকিস্তানের লাহোরে ঈদের চাঁদ দেখার পর থেকেই শুরু হওয়া আনন্দ মিছিল আর উৎসবমুখর পরিবেশ শহরটিকে এক মায়াবী রূপ দান করেছিল। নাইজেরিয়ার কানুর ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় ও রাজকীয় পদযাত্রা ছিল এবারের ঈদের অন্যতম বড় আকর্ষণ। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় এবার কয়েক মিলিয়ন মানুষ ‘মুদিক’ বা বাড়ি ফেরার উৎসবে শামিল হয়ে পারিবারিক সংহতির নজির গড়েছেন। দুবাই ও আবুধাবিতে আলোকসজ্জা আর বুর্জ খলিফার বিশেষ শো ঈদের আনন্দকে এক উচ্চমাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে এবারের ঈদে যুযুধান পক্ষগুলোর মধ্যে অস্ত্রবিরতি আর সাধারণ মানুষের মিলন ছিল এক প্রশান্তির খবর। লন্ডনের রাজপথে এবার বিশাল ঈদ উৎসবের আয়োজন করা হয়, যেখানে মেয়রের উপস্থিতিতে সব ধর্মের মানুষ অংশ নেয়। আমেরিকার টাইমস স্কোয়ারে হাজারো মানুষের নামাজ পড়ার দৃশ্যটি ছিল শান্তির এক নীরব প্রার্থনা, যা বিশ্বব্যাপী নজর কেড়েছে।

বিশ্বজুড়ে বেদনার প্রতিচ্ছবি-

যুদ্ধের উত্তেজনায় ইরানের বহু পরিবার এবার ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বোমার শব্দে সেখানে খুশির তকবির ঢাকা পড়ে গেছে। সিরিয়া ও ইরাকের কিছু অংশে চলমান অস্থিরতা ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে। সেখানে ঈদ এসেছে শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায়। গাজায় পর্যাপ্ত খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে ঈদের দিনটিও ছিল বিষণ্ণ। শিশুদের হাতে খেলনার বদলে ছিল ত্রাণের রুটি। অর্থনৈতিক ধস আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় লেবাননের সাধারণ মানুষের কাছে ঈদ ছিল শুধুই দীর্ঘশ্বাসের নাম। সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে কয়েক লাখ মানুষ এবার ঈদ কাটিয়েছে শরণার্থী শিবিরে, নিজ ভিটামাটি ছেড়ে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে অনেক দেশেই সাধারণ মানুষের পাতে জোটেনি ঈদের বিশেষ কোনো খাবার। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া হাজার হাজার শরণার্থীর কাছে ঈদের চাঁদ ছিল শুধুই এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সংকেত।

বাংলাদেশে আনন্দধারা-

বাংলার আকাশ-বাতাস যেন গেয়ে ওঠে- ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। ঘরে ঘরে আনন্দের জোয়ার আর একে অপরের প্রতি সৌহার্দ্যরে বন্ধন সুদৃঢ় হয়। ২০২৬ সালের ঈদে বাংলাদেশে দীর্ঘ সরকারি ছুটি থাকায় সাধারণ মানুষ নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছে। যান্ত্রিক শহর ছেড়ে নাড়ির টানে শেকড়ে ফেরার যে উৎসব, তা এবার ছিল অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্বতঃস্ফূর্ত। সদেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী এবার একই ময়দানে বা অনুষ্ঠানে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় লাখো মানুষের মিলনমেলা প্রমাণ করেছে ইসলামের প্রতি এ দেশের মানুষের অগাধ ভক্তি।

প্রবাস থেকে ফিরে আসা স্বজনদের নিয়ে গ্রামীণ জনপদে এবার খুশির ঢল নেমেছিল। ঘরে ঘরে ফিরনি, সেমাই আর পোলাওয়ের সুগন্ধে মণ্ডম করেছে সারাদেশ। গ্রাম-বাংলার চিরায়ত মেলাগুলো এবার ছিল উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে নাগরদোলা আর মাটির পুতুল শিশুদের মাতিয়ে রেখেছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হওয়ায় সাধারণ মানুষের কেনাকাটায় ছিল বাড়তি উৎসাহ। রঙিন পোশাকে শিশুদের ছোটাছুটি ছিল ঈদের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বিশেষ নাটক আর সিনেমার আয়োজন বিনোদনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

ঈদ উপলক্ষে অমুসলিম প্রতিবেশীদের বাড়িতে দাওয়াত দেওয়া ও উপহার বিনিময়ের মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ফুটে উঠেছে। বিভিন্ন শহরে ঈদ উপলক্ষে আয়োজিত বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও মিছিল যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। প্রতিটি মসজিদে দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্য যে বিশেষ মোনাজাত হয়েছে, তা ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ঈদের বাজারে উপচেপড়া ভিড় ছিল বাঙালির উৎসবপ্রিয়তার লক্ষণ।

প্রবীণদের মুখে অতীতের ঈদের গল্প শুনে নতুন প্রজন্মের শিক্ষা নেওয়া ছিল এক চমৎকার অভিজ্ঞতা। দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা প্রবাসীরা ভিডিও কলের মাধ্যমে দেশের স্বজনদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের কষ্টার্জিত অর্থে দেশের অর্থনীতি চাঙা হলেও বিদেশের মাটিতে তাদের ঈদ ছিল একাকিত্বের। বাংলাদেশের বেদনারক্ষণ-

এবারের ঈদেও ট্রেন ও বাসের ভয়াবহ সংঘর্ষে ১২ জনের করুণ মৃত্যু আনন্দের দিনে শোকের ছায়া ফেলেছে। ট্রনের ছাদে ও ট্রাকের ওপর গাদাগাদি করে মানুষের বাড়ি ফেরা ছিল জীবনের চরম ঝুঁকি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে অনেক শিশুকে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখা গেছে। বাজারের আগুমে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য ঈদের কেনাকাটা ছিল এক বড় সংগ্রাম। যারা সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন, তাদের কাছে এই ঈদ ছিল আজীবনের এক ক্ষত।

ব্যতিক্রমী এবারের ঈদ-

অতীতে ঈদ কার্ড আদান-প্রদান ছিল প্রধান, কিন্তু ২০২৬ সালে ভার্চুয়াল শুভেচ্ছা আর এআই-চালিত ভিডিও কল ব্যক্তিগত দূরত্বকে ঘুচিয়ে দিয়েছে অনেকাংশে। এবার দেখা গেছে প্লাস্টিক বর্জন করে পরিবেশবান্ধব ঈদ উদযাপনের এক নতুন ধারা, যা অতীতে বিরল ছিল। অতীতের ঈদগুলো যতটা শান্ত ছিল, এবারের ঈদ ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বব্যাপী অনেক বেশি উদ্বেগের মধ্যে পালিত হয়েছে।

বাংলাদেশে মধুর বেদনা-

ঈদের ছুটি শেষে যখন মানুষ শহরমুখী হয়, তখন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা গ্রাস করে। মা-বাবার মায়া আর গ্রামের শান্ত প্রকৃতি ছেড়ে যান্ত্রিক জীবনের এই প্রত্যাবর্তন ‘মধুর বেদনা’। প্রিয়জনের মায়া কাটিয়ে আবার একঘেয়েমিতে ফেরার এই দীর্ঘশ্বাসই ঈদের শেষ রেশ। আল্লামা ইকবালের ভাষায় বলা যায়, প্রাণের টানে মানুষ দূরে যায়, আবার প্রয়োজনের টানে ফিরে আসে। এই ফিরে আসাই জীবনের গতি। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতর আমাদের শিখিয়েছে সহমর্মিতা ও ধৈর্য। বিশ্বজুড়ে একদিকে যেমন যুদ্ধের দামামা আর খাদ্যাভাবের হাহাকার ছিল, অন্যদিকে ছিল মানবিক সংহতি। শেখ সাদী (রহ.) বলেছিলেন, ‘মানবজাতি একই দেহের অঙ্গের মতো।’ বিশ্বের কোথাও যখন বেদনা থাকে, তখন অন্য প্রান্তের আনন্দ পূর্ণতা পায় না। বাংলাদেশের মানুষের চিরাচরিত উৎসবমুখরতা আর বেদনার বাস্তব চিত্র আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিচ্ছবি।

পরিশেষে, ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতর আমাদের শিখিয়ে গেল যে, আনন্দ ও বেদনা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়- ‘পৃথিবী এক কঠিন কঙ্কাল, তবুও তার মধ্যে জীবন রয়েছে।’ সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে মানুষ আবারও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হবে এবং আগামী ঈদ হবে শুধুই আনন্দের- এই প্রত্যাশায় শেষ হলো এবারের স্মৃতির পাতা।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত