ঢাকা বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬, ১১ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

জ্বালানি সংকট মোকাবিলা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্ব

জ্বালানি সংকট মোকাবিলা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্ব

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সূচক নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও নাগরিক জীবনের চাহিদা মেটাতে জ্বালানি সংকট নিরসন এখন সময়ের দাবি। তবে এই সংকট থেকে উত্তরণ কোনো সাময়িক দাওয়াই দিয়ে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী, সমন্বিত এবং বাস্তবমুখী স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা।

দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসা এবং আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তেলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা আমাদের জ্বালানি খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি শিল্প উৎপাদনকে ব্যাহত করছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রপ্তানি খাতে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের জ্বালানি ব্যবহারের ধরনে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব মোকাবিলায় কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। অপচয় রোধই হলো জ্বালানি উৎপাদনের সবচেয়ে সহজ উপায়। সরকারি-বেসরকারি অফিস, শপিং মল এবং বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আলোকসজ্জা নিয়ন্ত্রণ এবং দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার উৎসাহিত করা প্রয়োজন। গ্যাস ও বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ দেশের জ্বালানি খাতের একটি বড় ক্ষত। কঠোর নজরদারির মাধ্যমে এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। পাশাপাশি বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে ‘সিস্টেম লস’ ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। পুরোনো ও কম দক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মেরামত বা সংস্কারের মাধ্যমে সেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। এতে একই পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করে বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। সারা দেশে দ্রুত প্রিপেইড মিটার স্থাপন করতে হবে যাতে গ্রাহক সচেতন হয় এবং বিলিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হতে হবে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভরতা অর্জন এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়া। আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। স্থলভাগের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমায় (ব্লু ইকোনমি) গ্যাস ও তেল অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দ্রুত কাজ শুরু করা প্রয়োজন। নিজস্ব গ্যাস উত্তোলিত হলে এলএনজি আমদানির বিশাল খরচ সাশ্রয় হবে। ভবিষ্যতের জ্বালানি হবে সবুজ ও টেকসই। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হবে।

২০৪১ সালের মধ্যে মোট জ্বালানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসার যে পরিকল্পনা রয়েছে, তার বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় উইন্ড মিল এবং সোলার পার্ক স্থাপনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পগুলো বেস-লোড বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ‘আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ কমিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। ভারত, নেপাল ও ভুটানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে জ্বালানি বিনিময়ের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ আমদানির মাধ্যমে সস্তায় ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা-

শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না, বরং জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন- পেট্রোবাংলা, পিডিবি) দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্নীতির পথ বন্ধ করতে হবে। জ্বালানি খাতে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে যাতে দেশীয় প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে আসতে পারেন।

জ্বালানি সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। সাময়িক লোডশেডিং বা সাশ্রয় নীতি দিয়ে হয়তো সংকট সামাল দেওয়া যায়, কিন্তু টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একটি মজবুত জ্বালানি কাঠামো। সরকার, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ জনগণ- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজকের সঠিক বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা ভবিষ্যতে একটি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে দেবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত