প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৬ মার্চ, ২০২৬
মানবসভ্যতার ইতিহাসে মাটি ও মানুষের সম্পর্ক চিরন্তন, আর সেই সম্পর্কের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতাতেই কৃষির জন্ম। ভোরের আলো ফোটার আগেই যে মানুষটি মাঠের পথে পা বাড়ান, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে জমির বুকে জীবনের বীজ বপন করেন, তিনি হলেন কৃষক। তার শ্রমের ফলেই ঘরে ওঠে ধান, বাজারে আসে শস্য, আর মানুষের জীবনধারা টিকে থাকে। তবু বিস্ময়কর সত্য হলো- সমাজে এই অন্নদাতাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার। পল্লীকবি জসিম উদ্দীন কৃষকের মর্যাদা তুলে ধরতে লিখেছিলেন, ‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা।’ কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই সম্মানের প্রতিফলন সবসময় দেখা যায় না।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে কৃষি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবু কৃষকের জীবন বাস্তবতায় নিরাপত্তা ও মর্যাদার ঘাটতি স্পষ্ট। একসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কৃষককে ‘অপমানিত’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। সময়ের প্রবাহে প্রযুক্তি ও নগরায়ণ যতই এগিয়েছে, কৃষকের প্রতি সেই অবমূল্যায়নের চিত্র পুরোপুরি বদলায়নি। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকটও এই পরিস্থিতি তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। আমাদের সমাজে পেশাকে অনেক সময় সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যে সম্মান দেওয়া হয়, কৃষক সেই মর্যাদা খুব কমই পান। ফলে কৃষিকে অনেক সময় শেষ বিকল্প পেশা হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতা ধীরে ধীরে কৃষকদের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে। অনেক কৃষকই চান না তাদের সন্তানরা ভবিষ্যতে কৃষির সঙ্গে যুক্ত হোক। এতে ভবিষ্যতে কৃষির ধারাবাহিকতা নিয়েও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও কৃষকের সংকটকে আরও গভীর করেছে। কৃষক সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করেন, কিন্তু বাজারে বিক্রির সময় তিনি ন্যায্য মূল্য পান না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কৃষক যে সবজি বা ধান কম দামে বিক্রি করেন, শহরের বাজারে সেই একই পণ্য কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। মাঝখানের এই বিশাল ব্যবধানের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী বা বাজার সিন্ডিকেটের হাতে। ফলে উৎপাদক হিসেবে কৃষকের প্রাপ্য আয় তার হাতে পৌঁছায় না। সরকারি তথ্য অনুযায়ী অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৫ বলছে, দেশের মোট জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪ শতাংশের বেশি মানুষ সরাসরি কৃষির সঙ্গে যুক্ত। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব এখনও অত্যন্ত বড়। কিন্তু কৃষকের গড় আয় অন্যান্য পেশার তুলনায় কম এবং অনিশ্চিত। কৃষি উপকরণের দাম প্রতি বছর বাড়লেও ফসলের দাম সেই অনুপাতে বাড়ে না। ফলে অনেক প্রান্তিক কৃষক ধীরে ধীরে জমি হারিয়ে কৃষিশ্রমিকে পরিণত হচ্ছেন, কেউ আবার বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। প্রকৃতিনির্ভরতার ঝুঁকিতে রয়েছে কৃষিখাত। বাংলাদেশের কৃষি এখনও অনেকাংশে আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসময়ে বৃষ্টি, খরা, বন্যা কিংবা শিলা বৃষ্টি মুহূর্তেই একটি মৌসুমের ফসল নষ্ট করে দিতে পারে। অধিকাংশ কৃষকের কাছে কার্যকর ফসল বিমা না থাকায় এই ক্ষতির বোঝা সরাসরি তাদের ওপরই এসে পড়ে। ফলে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনেক সময় পুরো বছরের শ্রমকে মুছে দেয়। চলমান এই বাস্তবতায় কৃষির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। কৃষিকে শুধু কায়িক শ্রমের পেশা হিসেবে না দেখে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানো এবং সরাসরি বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং কার্যকর ফসল বিমা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা ও গণমাধ্যমেও কৃষির মর্যাদা তুলে ধরা প্রয়োজন।
একটি সত্য কখনও অস্বীকার করা যায় না, ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’। খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি এই কৃষিই। তাই অন্নদাতার মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গঠনের অপরিহার্য শর্ত। কৃষকের মুখের হাসিই হোক বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।
ফয়সল আহমদ বাবুল
সিনিয়র শিক্ষক (কৃষি), সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা, সদর, সিলেট