প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৬ মার্চ, ২০২৬
আজ ২৬ মার্চ। বাঙালির আত্মপরিচয় ও শৌর্যবীর্যের এক অনন্য দিন- মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ৫৪ বছর আগে এই দিনে হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে একটি স্বাধীন মানচিত্র ও নিজস্ব পতাকার নেশায় বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মরণপণ যুদ্ধে। যে স্বপ্ন নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল, তার মূলে ছিল দুটি প্রধান স্তম্ভ : ‘মুক্তি’ ও ‘সাম্য’। আজ অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে এসে আমাদের ভাবনার কেন্দ্রে থাকা উচিত- আমরা কতটা সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি এবং আগামীর অঙ্গীকার ঠিক কী হওয়া উচিত।
স্বাধীনতা মানে শুধু একটি ভূখণ্ড বা একটি পতাকা পাওয়া নয়। স্বাধীনতার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত থাকে নাগরিকের অর্থনৈতিক মুক্তি, বাক-স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির মধ্যে। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের চোখে স্বপ্ন ছিল এমন একটি রাষ্ট্রের, যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য, যেখানে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা ও চিকিৎসা হবে সবার জন্য সমান সুযোগের। আজ স্বাধীনতা দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন যে, সেই বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার পথে আমরা কতটুকু এগিয়েছি।
একটি দেশকে শুধু জিডিপি (GDP) বা মাথাপিছু আয় দিয়ে পরিমাপ করলে তার সামগ্রিক সুখের চিত্র ফুটে ওঠে না। ‘সুখী দেশ’ হতে হলে প্রয়োজন সুশাসন। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, আইনের শাসন এবং প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি সুখী সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত।
দুর্নীতি রোধ : উন্নয়নের সুফল যখন গুটি কয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা জন্মে। সমৃদ্ধির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুর্নীতি। তাই স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার হওয়া উচিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance)।
মানবাধিকার ও গণতন্ত্র : মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা একটি জাতিকে মানসিকভাবে সমৃদ্ধ করে। যখন নাগরিকরা নির্ভয়ে তাদের দাবি তুলে ধরতে পারে, তখনই রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে কল্যাণকামী হয়ে ওঠে।
বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। কৃষি থেকে শিল্প-সবখানেই আজ অগ্রগতির ছোঁয়া। তবে এই সমৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে আমাদের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
বর্তমানে আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে পদার্পণ করেছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স এবং ন্যানোটেকনোলজির এই যুগে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়েই আমরা উন্নত বিশ্বের কাতারে নাম লেখাতে পারি।
সমৃদ্ধি যদি পরিবেশকে ধ্বংস করে আসে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে আমাদের উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই। সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ রেখে যাওয়াই হোক আজকের শপথ।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগাতে হবে। স্বাধীনতার চেতনা কোনো জাদুঘরে রাখার বিষয় নয়, বরং তা হৃদয়ে ধারণ করে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করার বিষয়। তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেমের পাশাপাশি বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন জরুরি। তারা যেন শুধু চাকরিজীবী না হয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। ‘অতীতের ত্যাগ আমাদের প্রেরণা, বর্তমানের শ্রম আমাদের পাথেয় এবং ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি আমাদের লক্ষ্য।’
একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার পথে প্রধান অন্তরায় হলো রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন। জাতীয় ইস্যুতে সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া আজ সময়ের দাবি। দেশপ্রেম যখন দল-মতের ঊর্ধ্বে স্থান পায়, তখনই জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্রই ছিল ঐক্য। সেই ঐক্যবদ্ধ শক্তিই পারে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে।
স্বাধীনতা দিবস শুধু উৎসব পালনের দিন নয়, এটি আত্মোপলব্ধির দিন। পঁচিশে মার্চের কালো রাতে যারা প্রাণ দিয়েছেন এবং নয় মাস যারা অকাতরে রক্ত ঝরিয়েছেন, তাদের আত্মদান সার্থক হবে তখনই, যখন এই দেশের প্রতিটি ঘরে সুখের প্রদীপ জ্বলবে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরমুক্ত একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়াই হোক ২০২৬ সালের এই স্বাধীনতা দিবসের প্রধান অঙ্গীকার। আসুন, আমরা যে যার অবস্থান থেকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করি। ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দেশপ্রেমকে বড় করে দেখি। তবেই আমরা বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে বলতে পারব- আমরা একটি স্বাধীন, সুখী ও সমৃদ্ধ জাতি।