জ্ঞানভিত্তিক সমাজের সংকট ও মেধা পাচার
মো. শাহিন আলম
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটি কালজয়ী উক্তি মনে পড়ে যায়, যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মাতে পারে না। দেশ স্বাধীনের পূর্বেই প্রয়াণ ঘটা এই কিংবদন্তি ভাষাবিদের বাণীতে আজ আমাদের শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়তে হয়। প্রজন্ম হিসেবে আমরা ‘জেন-জি’ বা জেনারেশন জেড। আমরা হয়তো স্বচক্ষে পূর্বপুরুষদের সেই উত্তাল লড়াই-সংগ্রাম দেখিনি; কিন্তু ইতিহাসের পাতায় পড়েছি কীভাবে একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ রাষ্ট্রকে মুক্তির পথে নিয়ে যায়।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডই হলো তার জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি মোড়ে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণি যে অসামান্য নেতৃত্ব দিয়েছিল, তার মূলে ছিল উচ্চশিক্ষার এক নৈতিক ও বৌদ্ধিক শক্তি। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেও আমরা এক অদ্ভুত ও শঙ্কার পরিস্থিতির মুখোমুখি। আজ আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর অধিকাংশ মেধাবী তরুণের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশত্যাগ। একসময় উচ্চশিক্ষা ছিল দেশ গড়ার হাতিয়ার, আর আজ তা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশ ছাড়ার ‘পাসপোর্ট’। এই যে মেধা পাচার বা ‘ব্রেইন ড্রেন’, একে কি শুধুই ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখার সুযোগ আছে? নাকি এটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত ব্যর্থতার এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ?
এই কাঠামোগত ব্যর্থতার স্বরূপ বুঝতে হলে আমাদের খুব বেশি পেছনে তাকাতে হবে না। বছর দেড়েক আগেই দেশে একটি বড়সড় গণঅভ্যুত্থান হয়ে গেল, যার সূচনাপর্বে রাজপথ প্রকম্পিত হয়েছিল একটি শক্তিশালী স্লোগানে, ‘কোটা না মেধা? মেধা, মেধা!’ সেই সময় তরুণ প্রজন্মের এই হাহাকার ছিল মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে নিজেদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই। মেধা মূল্যায়নের বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে তারা রাজপথে আছড়ে পড়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সেই অভ্যুত্থানের চেতনা এবং মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ার যে স্বপ্ন তরুণরা দেখেছিল, তার বাস্তবায়ন যদি প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে দৃশ্যমান না হয়, তবে মেধা পাচারের এই প্রবল স্রোত থামানো প্রায় অসম্ভব। যোগ্যতার পরিবর্তে যখন তদবির জাতীয় অন্যান্য প্রভাবক মূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তখন মেধাবীরা সেখানে নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পাবে না, সেটাই স্বাভাবিক। তারা মনে করে, এ দেশ তাদের মেধার কদর করতে জানে না, আর এই আস্থার সংকটই শেষ পর্যন্ত তাদের বিদেশের মাটিতে ঠেলে দেয়।
গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স বা বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান পর্যালোচনা করলে এক হতাশাজনক চিত্র ফুটে ওঠে। এই তালিকায় প্রতিবেশী ভারত বা শ্রীলঙ্কা তো বটেই, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের নিচেও আমাদের অবস্থান। যুগের চাহিদা বিবেচনায় আঞ্চলিক দেশগুলো যখন প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও গবেষণায় শতকোটি ডলার বিনিয়োগ করছে, সেখানে আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এখনও মান্ধাতা আমলের কারিকুলাম এবং তাত্ত্বিক পড়াশোনার বৃত্তে বন্দি।
?বিশ্ব আজ পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের (ইন্ডাস্ট্রি ৫.০) চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মানুষের সৃজনশীলতার সমন্বয়, টেকসই উন্নয়ন এবং মানবিক যন্ত্র-সহাবস্থান নিয়ে কাজ করছে, অথচ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ বিভাগে এখনও ২০ থেকে ৩০ বছর আগের পাঠ্যসূচি পড়ানো হচ্ছে। এখানে বড় অভাব মূলত ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন’-এর। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামের সঙ্গে দেশের শিল্প খাতের ন্যূনতম কোনো যোগসূত্র নেই বললেই চলে। ফলে একজন শিক্ষার্থী স্নাতক বা স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পরও দেশীয় বা আন্তর্জাতিক কর্মবাজারের প্রতিযোগিতায় নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেন না। এই ‘স্কিল গ্যাপ’ বা দক্ষতা ও চাহিদার মধ্যকার দূরত্ব মেধাবীদের মধ্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি করে, যা তাদের বিদেশের আধুনিক ও প্রায়োগিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি প্রলুব্ধ করে।
বলাবাহুল্য, দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান বাড়ছে কি? যত্রতত্র অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রি প্রদানের ফলে আমরা হয়তো একটি বড় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী পাচ্ছি; কিন্তু কতটা দক্ষ হিসেবে তাদের গড়ে তোলা হচ্ছে- সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চমূল্যের শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণে রূপান্তরিত করেছে। একজন শিক্ষার্থী যখন কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করে ডিগ্রি নেন, তখন তার মাথায় প্রথম চিন্তাই থাকে এই বিনিয়োগ দ্রুত উসুল করা। দেশের সংকুচিত কর্মবাজার এবং রাজনৈতিক পরিবেশ যখন তাকে সেই নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তখন তিনি উন্নত বিশ্বের উচ্চ বেতনের হাতছানিতে সাড়া দেন।
অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মানেই নতুন জ্ঞান সৃষ্টির ল্যাবরেটরি। কিন্তু আমাদের বাজেট বরাদ্দে শিক্ষা ও গবেষণার অবস্থান সবচেয়ে নিচে। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪-৬ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত হলেও আমাদের দেশে তা সাধারণত ২ শতাংশের নিচে ঘুরপাক খায়, যার বড় অংশ আবার খরচ হয় প্রশাসনিক কাজে। মৌলিক গবেষণার অভাবে আমাদের শিক্ষকরাও অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বমানের জ্ঞান সৃষ্টিতে পিছিয়ে পড়ছেন। গবেষণার উপযুক্ত ল্যাবরেটরি নেই, নেই ডাটা এক্সেসের সুবিধা। ফলে যারা গবেষণায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের সামনে দেশত্যাগের বিকল্প থাকে না। ভারত বা ভিয়েতনামের মত প্রতিবেশী দেশগুলো যেখানে গবেষণায় বিনিয়োগ করে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে, সেখানে আমরা মেধা রপ্তানি করে এক ধরনের আত্মঘাতী পথে হাঁটছি।
অনেকে প্রায়ই যুক্তি দেন যে, মেধা পাচারের ফলে প্রবাসে আমাদের দক্ষ জনবল বাড়ছে এবং রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি ভয়াবহ ভুল ধারণা। একজন অদক্ষ শ্রমিক বিদেশে গিয়ে যে রেমিট্যান্স পাঠান, তার চেয়ে একজন দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক বা ডাক্তার দেশে থাকলে যে ‘ভ্যালু অ্যাড’ করতে পারতেন, তার অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্য অনেক বেশি। বাস্তবতা হলো, আমরা দেশের সাধারণ মানুষের করের টাকায় বিভিন্ন সেক্টরগুলোতে বিশেষজ্ঞ তৈরি করছি, আর তার অর্জিত জ্ঞান ও সেবার চূড়ান্ত সুফল ভোগ করছে আমেরিকা বা ইউরোপের উন্নত দেশগুলো। এটি পরোক্ষভাবে দরিদ্র দেশ থেকে ধনী দেশে মেধা ও সম্পদের এক ধরনের ‘নব্য-উপনিবেশবাদী’ স্থানান্তর।
তবে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে ছাত্ররাজনীতির বিবর্তনের কারণে। ছাত্ররাজনীতি একসময় ছিল জাতীয় নেতৃত্বের সূতিকাগার, যেখানে মেধা ও আদর্শের লড়াই হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আমরা দেখেছি, সুস্থ ধারার মেধাভিত্তিক রাজনীতির বদলে যদি পেশিশক্তি এবং সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থই শেষ কথা হয়, তবে মেধাবী শিক্ষার্থীরা রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। আর মেধাবীরা যখন নীতি-নির্ধারণী নেতৃত্ব থেকে দূরে থাকে, তখন রাষ্ট্র পরিচালনায় ভুল সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যা পরোক্ষভাবে মেধা পাচারকে আরও উসকে দেয়। ছাত্র ও দলীয় সংগঠনগুলোকে আজ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে তারা কি শুধু মিছিল-মিটিংয়ের জনবল তৈরি করবে, নাকি আগামীর বিশ্ব জয়ের জন্য মেধাবী নেতৃত্ব গড়বে? সেই নেতৃত্ব তৈরির উদ্যোগ আদৌ নেওয়া হবে কি না এবং হলেও তা কতটা ফলপ্রসূ হবে, সেই প্রশ্নটি আজ সচেতন মহলের কাছে রেখে গেলাম।
সামাজিকভাবেও এর প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। মেধাবীরা দলে দলে দেশান্তরী হওয়ায় সমাজে এক ধরনের বৌদ্ধিক শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। প্রতিটি সেক্টরে আজ সাহসী, প্রজ্ঞাবান এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের যে অভাব আমরা দেখি, তা মূলত এই মেধা পাচারেরই বিষময় ফল।
?তবে এটিও সত্য, মেধা পাচার রোধে শুধু দেশপ্রেম কিংবা সামজিক দায়বদ্ধতার দোহাই দিয়ে তরুণদের আটকে রাখা সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেন’ বা পাচার হওয়া মেধাকে সসম্মানে ফিরিয়ে আনার কার্যকর রাষ্ট্রীয় পলিসি। এর জন্য প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে একটি মজবুত সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে, যাতে উচ্চতর শিক্ষা সরাসরি দেশের অর্থনীতি ও শিল্পখাতে অবদান রাখতে পারে। সেই সঙ্গে মেধাবীদের জন্য দেশে একটি মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষায়িত বেতন স্কেল, আকর্ষণীয় রিসার্চ ফেলোশিপ এবং স্টার্টআপ ইনকিউবেশনের মতো সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তাদের মেধার যথাযোগ্য মূল্যায়ন করতে হবে। যখন একজন গবেষক বা বিশেষজ্ঞ দেখবেন যে নিরাপদ কর্মপরিবেশের মাধ্যমে তার অর্জিত জ্ঞান নিজ দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বা শিল্পবিপ্লবে সরাসরি ভূমিকা রাখছে, তখনই তিনি বিদেশের মোহ ত্যাগ করে নাড়ির টানে দেশে ফেরার প্রেরণা পাবেন।
পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রের অন্যায্য মূল্যায়ন, জরাজীর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা আর সুস্থ রাজনীতির অনুপস্থিতির বিরুদ্ধে মেধাবীদের দেশত্যাগ আসলে এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ।
আমরা যদি কেবল মেগাপ্রজেক্ট আর অবকাঠামোগত উন্নয়নকেই উন্নতির মাপকাঠি মনে করি, তবে অচিরেই দেখতে পাব, সেই কাঠামো পরিচালনার জন্য হয়তো কোনো দক্ষ মস্তিষ্ক এ দেশে অবশিষ্ট নেই। আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার কারিগররা যদি বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরাতে বাধ্য হন, তবে আমাদের স্বাধীনতার চেতনা অপূর্ণই থেকে যাবে। সময় এসেছে তরুণদের হাতে দেশ গড়ার কার্যকর চাবিকাঠি তুলে দেওয়ার। আমাদের অনুধাবন করতে হবে মাথা ছাড়া যেমন শরীর প্রাণহীন, তেমনি মেধা ছাড়া রাষ্ট্র একটি অন্তঃসারশূন্য সত্তা মাত্র। মেধার এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে না পারলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না; বরং এক মেধাহীন ও নেতৃত্বহীন অন্ধকারের দিকে আমরা ধাবিত হবো। তরুণ প্রজন্ম শুধু সুযোগ চায়, সম্মান চায়; আর রাষ্ট্র যদি সেই নিশ্চয়তা দিতে পারে, তবেই ‘ব্রেইন ড্রেন’ রূপান্তরিত হবে ‘ব্রেইন গেইন’-এ।
মো. শাহিন আলম
কলাম লেখক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
