পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, ভূগোল ও অখণ্ড পরিচয়ের বাস্তবতা

এম মহাসিন মিয়া

প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বহু শতাব্দী ধরে চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক অখণ্ড অংশ হিসেবে পরিচিত। আজকের প্রশাসনিক বিভাজনে এটি তিনটি জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত হলেও ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে এই অঞ্চলকে আলাদা কোনো রাষ্ট্রিক সত্তা হিসেবে দেখা যায় না। বরং নানা সময় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তন ঘটলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম সর্বদাই বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও বাংলার ভূখণ্ডের অংশ হিসেবেই পরিচিত ছিল।

ইতিহাসের প্রাচীন পর্যায়ে এই অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন উপজাতি জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সামাজিক কাঠামো ও সংস্কৃতি নিয়ে বসবাস করলেও ভূ-রাজনৈতিকভাবে অঞ্চলটি চট্টগ্রামকেন্দ্রিক প্রশাসনিক প্রভাবের অধীন ছিল।

মধ্যযুগে বঙ্গ অঞ্চলের শাসনব্যবস্থা বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলটি বিভিন্ন সময় স্বাধীন সুলতানি শাসন, আরাকান রাজ্য এবং পরে মুঘল প্রশাসনের অধীনে আসে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম কখনোই স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং প্রতিবেশী শক্তিগুলোর প্রশাসনিক প্রভাবের মধ্যেই পরিচালিত হয়েছে।

১৭০০ শতকে মুঘল সাম্রাজ্য চট্টগ্রাম অঞ্চল দখল করার পর পাহাড়ি এলাকাগুলোও ধীরে ধীরে তাদের প্রশাসনিক প্রভাবের আওতায় আসে। যদিও দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বশাসনের ঐতিহ্যের কারণে সরাসরি শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর ছিল না, তবুও কর আদায় ও সীমান্ত প্রশাসনের ক্ষেত্রে মুঘল কর্তৃত্ব স্বীকৃত ছিল। এ সময় থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে চট্টগ্রাম প্রশাসনিক অঞ্চলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়।

পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর এই অঞ্চলের প্রশাসনিক কাঠামো আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়। ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস’ নামে একটি পৃথক প্রশাসনিক জেলা গঠন করে, যা মূলত শাসন ও প্রশাসনের সুবিধার্থে করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত সামাজিক কাঠামোকে আংশিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সার্কেল চিফদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালিত হয়।

তবে এটি কোনো পৃথক রাষ্ট্র বা ভিন্ন দেশের অংশ ছিল না, বরং ব্রিটিশ ভারতের চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্ভুক্ত একটি বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে পরিচালিত হতো।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হয়। সে সময় অঞ্চলের কিছু অংশে ভিন্ন দাবিও উঠেছিল। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ববাংলার অংশ হিসেবে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাধ্যমে এই অঞ্চলও স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম বহু জাতিগোষ্ঠীর আবাসস্থল। বাঙালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, খিয়াংসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বসবাস করছে। তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে, যা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তবে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই অঞ্চল চট্টগ্রাম এবং বাংলার ভৌগোলিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই পরিচিত।

ভূগোলের দিক থেকেও পার্বত্য চট্টগ্রাম মূলত চট্টগ্রাম উপকূলীয় সমভূমির সম্প্রসারিত পাহাড়ি অংশ। কর্ণফুলী, সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর মতো নদীগুলো এই পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে চট্টগ্রামের সমভূমির দিকে প্রবাহিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতির দিক থেকেও এটি বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা নেওয়া হয় এবং স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন কাঠামোকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এসব পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই অঞ্চলের জনগণের উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং জাতীয় মূলধারার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা আরও সুদৃঢ় করা।

সবশেষে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম ইতিহাস, ভূগোল ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার দিক থেকে চট্টগ্রাম ও বাংলার অখণ্ড অংশ। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও অঞ্চলটি কখনো স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বা ভিন্ন দেশের স্থায়ী অংশে পরিণত হয়নি। বরং বহুজাতিক সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে এটি বাংলাদেশের ইতিহাস ও ভূগোলের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামকে বোঝার ক্ষেত্রে ইতিহাসের বাস্তবতা, ভূগোলের ধারাবাহিকতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ও প্রয়োজনীয়।

এম মহাসিন মিয়া

আঞ্চলিক বিশ্লেষক ও লেখক, পার্বত্য চট্টগ্রাম