দক্ষ মানবসম্পদ : অর্থনৈতিক মুক্তির মূল চাবিকাঠি

প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি শুধু তার সুউচ্চ অট্টালিকা বা জিডিপির পরিসংখ্যান নয়, বরং সেই দেশের মানুষের দক্ষতা। বর্তমান বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়েও ‘মানবিক সম্পদ’ বা হিউম্যান ক্যাপিটাল অনেক বেশি শক্তিশালী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বিশাল জনসংখ্যাকে যদি যথাযথ শিক্ষা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং পেশাদারিত্বের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা যায়, তবেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি ত্বরান্বিত হবে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগানোর সুযোগ চিরকাল থাকে না। অদক্ষ জনশক্তি একটি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা, কারণ তারা উৎপাদনশীলতায় অবদান রাখতে পারে না বরং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ক্ষেত্র তৈরি করে। কিন্তু এই জনশক্তিকে যখন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত করা হয়, তখন তারা সম্পদে রূপান্তরিত হয়। দক্ষ জনবল শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও উচ্চমূল্যে সমাদৃত হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে।

আমরা বর্তমানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের (4IR) মুখোমুখি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স এবং অটোমেশনের এই যুগে প্রথাগত সাধারণ শিক্ষা দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। আগামী এক দশকে বর্তমানের অনেক পেশা বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং নতুন নতুন পেশার উদ্ভব হবে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।

প্রযুক্তিগত জ্ঞান : কোডিং, ডেটা সায়েন্স এবং ডিজিটাল লিটারেসি এখন বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার মৌলিক হাতিয়ার। সফট স্কিলস : সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সৃজনশীল চিন্তা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী ছাড়া উচ্চতর পদে আসীন হওয়া অসম্ভব। বৃত্তিমূলক শিক্ষা: শুধুমাত্র উচ্চতর ডিগ্রির পেছনে না ছুটে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে।

দক্ষ মানবসম্পদ কীভাবে একটি দেশকে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখায়, তা নিচের কয়েকটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যায়-

বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স : বর্তমানে আমাদের দেশ থেকে যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের একটি বড় অংশই অদক্ষ শ্রমিক। ফলে তারা কঠোর পরিশ্রম করেও নিম্ন মজুরি পান। আমরা যদি দক্ষ নার্স, আইটি বিশেষজ্ঞ, ইঞ্জিনিয়ার বা ইলেকট্রিশিয়ান পাঠাতে পারি, তবে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ : বিদেশি বিনিয়োগকারীরা (FDI) সেই দেশেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় যেখানে সুলভ মূল্যে দক্ষ শ্রমশক্তি পাওয়া যায়। দক্ষ কর্মী থাকলে উৎপাদন খরচ কমে এবং পণ্যের গুণগত মান বাড়ে, যা আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারে আমাদের অবস্থান সুসংহত করবে।

উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান : সবাই চাকরির পেছনে না ছুটে যখন দক্ষতা অর্জন করে নিজেই উদ্যোক্তা হয়ে ওঠে, তখন সেটি অর্থনীতির চাকা আরও দ্রুত ঘুরায়। দক্ষ মানবসম্পদ নতুন নতুন স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) গড়ে তুলতে সক্ষম।

বাংলাদেশে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পথে প্রধান অন্তরায় হলো মান্ধাতা আমলের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব। এখনও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তত্ত্বীয় জ্ঞানের ওপর বেশি নির্ভরশীল, ব্যবহারিক প্রয়োগের অভাব এখানে প্রকট।

এছাড়া কারিগরি শিক্ষাকে সামাজিকভাবে কিছুটা ‘নিম্নমানের’ ভাবার যে মানসিকতা রয়েছে, সেটিও একটি বড় বাধা। এই সংকট উত্তরণে রাষ্ট্র ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকারি পলিটেকনিক ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলোর মান উন্নয়ন করতে হবে। পাশাপাশি শিল্পের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার যোগসূত্র স্থাপনে ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ’ জোরদার করা জরুরি।

একটি জাতির অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং এটি সুপরিকল্পিত বিনিয়োগের ফসল। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধিই হলো সবচেয়ে টেকসই বিনিয়োগ। আমরা যদি আমাদের এ বিশাল তরুণ সমাজকে আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারি, তবে দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক মুক্তি শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। মনে রাখতে হবে, সম্পদ সীমিত হতে পারে; কিন্তু মানুষের মেধা ও দক্ষতার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।