প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৮ মার্চ, ২০২৬
বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫৬ বছরে পদার্পণ করেছে। এই দীর্ঘসময় ধরে দেশটি দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও অনগ্রসরতার সীমা পেরিয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্প খাতের সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার বিস্তার এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন- এসবই দেশের অর্জনের দৃশ্যমান চিত্র। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশ এখন উদীয়মান অর্থনীতির প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত।
কিন্তু এই অর্জনের আড়ালে লুকিয়ে আছে কঠিন বাস্তবতা- ক্ষুধা এবং বৈষম্য। দেশের অগ্রগতির পরিসংখ্যান যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি জনগণের দৈনন্দিন জীবনে অনেকেই এখনও সেই অগ্রগতি থেকে বঞ্চিত। উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি। এ অবস্থার ফলে আমাদের সামনে জাগে মৌলিক প্রশ্ন- উন্নয়ন কি সত্যিই অন্তর্ভুক্তিমূলক, নাকি শুধু পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ?
অর্জন বনাম বাস্তবতা : বাংলাদেশের অর্থনীতি গত পাঁচ দশকে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়েছে। মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ এবং নারী ক্ষমতায়নের বৃদ্ধি এই অগ্রগতির সাক্ষ্য দেয়। তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল রূপান্তর দেশের অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে দৃঢ় করেছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির সুফল সব মানুষের জীবনে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সীমিত কিছু গোষ্ঠীর হাতে আয়ের কেন্দ্রভূতকরণ, শহর ও গ্রামের মধ্যে সুযোগের পার্থক্য এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা- এসবই আমাদের সামনে উন্নয়নের অসাম্য তুলে ধরে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলেও তার মানবিক প্রতিফলন অনেকাংশে সীমিত থেকে যায়।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের মান যেমন শহরের বিত্তবানদের জন্য সহজলভ্য, তেমনি গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। শিশুদের পুষ্টিহীনতা, অর্ধশিক্ষিত তরুণ, এবং অসংখ্য নারী এখনও উন্নয়নের মূল স্রোতে প্রবেশ করতে পারছে না।
ক্ষুধা : সমাজের নীরব সংকট : খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা এখনও সবার জন্য নিশ্চিত হয়নি। বাজারে খাদ্য থাকলেও এর ক্রয়ক্ষমতা অনেকের নেই। গ্রামীণ দরিদ্র পরিবার, নদীভাঙন ও খরারকবলিত মানুষ, শহরের নিম্ন আয়ের বস্তিবাসী- তাদের জন্য প্রতিদিনের খাবার নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ১০-১২% মানুষ এখনও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। শিশু ও নারীর মধ্যে পুষ্টিহীনতা দেশের স্বাস্থ্য সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই ক্ষুধা শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি জাতির মানবসম্পদ, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কৃষির অস্থিরতা- এসব কারণে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বন্যা, খরা, নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু ক্ষতি নয়, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলে, যা পরবর্তীতে দেশের মানবসম্পদ ও কর্মদক্ষতাকে সীমিত করে।
বৈষম্য : সমাজের কাঠামোগত অসাম্য : বাংলাদেশে বৈষম্য বহুস্তরীয় এবং বহুমাত্রিক। আয় বৈষম্য ছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং সুযোগের ক্ষেত্রে অসাম্য স্পষ্ট।
শহর ও গ্রামের মধ্যে পার্থক্য এতটাই স্পষ্ট যে শহরের মানুষ যেখানে উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসা সহজেই পায়, গ্রামের মানুষ সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী- নারী, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা- এখনও সমাজের মূলধারা থেকে অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন।
বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক ও মানসিক দূরত্বও তৈরি করে, যা সমাজে হতাশা, অসন্তোষ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সমাজ যখন দেখবে কিছু মানুষ অবিচার ও প্রভাবের মাধ্যমে সুবিধা পাচ্ছে, তখন দীর্ঘমেয়াদে সেই সমাজের স্থিতিশীলতা বিপন্ন হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশের সর্বোচ্চ ১০% ধনী জনগণের আয় ও সম্পদ দেশের ৪০% নিম্ন আয়ের মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান- সবক্ষেত্রেই বৈষম্য স্পষ্ট। এই বৈষম্য শুধু দারিদ্র্য বাড়ায় না, বরং মানুষের সামাজিক অধিকার ও মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ক্ষুধা ও বৈষম্যের আন্তঃসংযোগ : ক্ষুধা ও বৈষম্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বৈষম্যের কারণে দরিদ্র মানুষ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, ফলে তারা দারিদ্র্য ও ক্ষুধার চক্রে আটকে থাকে। অন্যদিকে, ক্ষুধা মানুষের উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে, যা তাকে আরও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে দেয়। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে না পারলে উন্নয়ন কখনোই টেকসই হবে না। তাই ক্ষুধা ও বৈষম্য একসঙ্গে মোকাবিলা করা একান্ত প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, একটি গ্রামীণ পরিবার যা বছরজুড়ে কাজ করে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারে না, তাদের সন্তানরা শিক্ষা গ্রহণে পিছিয়ে পড়ে। এরপর সেই শিশু অপরিণত মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতায় বড় হয়ে আসে। এটি শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, সামগ্রিক জাতির জন্যও ক্ষতিকর।
৫৬ বছরের অর্জন ও চ্যালেঞ্জ : বাংলাদেশের অর্জন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার বিস্তারও দৃশ্যমান। কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সুষমভাবে বণ্টিত হয়নি। সুবিধা মূলত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত। ফলে সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী এখনও মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই বৈষম্য যদি দীর্ঘমেয়াদে সমাধান না হয়, তাহলে উন্নয়নের লক্ষ্য সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হবে না।
উন্নয়ন সঠিকভাবে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে, দেশের অর্জন কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জাতির মানসিক স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বর্তমান সরকারের প্রতি প্রত্যাশা : একটি ক্ষুধা ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য সরকারকে কার্যকর নীতি ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষভাবে-
* খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি কর্মসূচি জোরদার করা : দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য সহায়তা ও পুষ্টি কর্মসূচি সম্প্রসারণ।
* বাজার নিয়ন্ত্রণ ও দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীলতা : খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা।
* কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন : যুবসমাজের জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি।
* শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সমতা : গ্রাম-শহরের বৈষম্য কমিয়ে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা।
* প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা ও সম্পদের সুষম বণ্টন : উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের কাছ থেকে ন্যায্য কর আদায় করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যয় বৃদ্ধি।
* দুর্নীতি দমন ও সুশাসন : প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
* প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি : নারী, প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য বিশেষ নীতি গ্রহণ।
নাগরিক সমাজের ভূমিকা : ক্ষুধা ও বৈষম্য দূরীকরণে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বিত্তবানদের উচিত দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। সামাজিক সহমর্মিতা, দানশীলতা ও মানবিক উদ্যোগ সমাজকে আরও ন্যায়ভিত্তিক করতে পারে।
শিক্ষক, সমাজকর্মী, উদ্যোক্তা ও সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া ক্ষুধা ও বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। স্থানীয় সম্প্রদায়, এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও পুষ্টি কার্যক্রমের সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি। পরিশেষে বলতে চাই, ৫৬ বছরের অর্জন আমাদের গর্বিত করে, কিন্তু সেই অর্জন তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তা প্রতিটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—উন্নয়নকে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক করা।
ক্ষুধামুক্ত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ কোনো স্বপ্ন নয়; এটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য। সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সম্মিলিত উদ্যোগ নিশ্চিত করলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। একটি মানবিক, সমতাভিত্তিক ও টেকসই বাংলাদেশের স্বপ্নই হোক আগামী দিনের পথচলার দিশা।
ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
লেখক, কলাম লেখক ও গবেষক প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি