ঢাকা শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৪ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

অপরাধীর দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করাই ধর্ষণ প্রতিরোধের একমাত্র উপায়

মো. তাহমিদ রহমান
অপরাধীর দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করাই ধর্ষণ প্রতিরোধের একমাত্র উপায়

দেশে ধর্ষণ আজ এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরপর কয়েকটি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যার ঘটনা দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর আমরা ক্ষোভে ফেটে পড়ি, মানববন্ধন করি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাই, কঠোর শাস্তির দাবি তুলি। কিন্তু সময়ের স্রোতে সবকিছু স্তিমিত হয়ে যায়, আর অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। প্রশ্ন জাগে কেন একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটছে? এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। পাবনায় দাদিকে হত্যা করে কিশোরী নাতনিকে ফসলের খেতে টেনে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে। নরসিংদীতে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের শিকার একটি মেয়ের পরিবার বিচার চেয়েছিল স্থানীয়ভাবে। মেয়েটি পরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। সীতাকুণ্ডে সাত বছরের শিশুকে যৌন সহিংসতার পর গলা কেটে দেওয়া হয়। রক্তাক্ত শিশুটি জঙ্গল থেকে একা হেঁটে বের হয়েছিল, যা দেখে অনেকে শিউরে ওঠেন। দেড় দিন লড়াইয়ের পর হাসপাতালে মৃত্যু হয় শিশুটির। এই ঘটনাগুলো স্পষ্টত চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমরা এখনও সভ্য হয়ে উঠতে পারিনি। ধর্ষণ শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের চূড়ান্ত রূপ। এটি একজন নারীর শারীরিক সত্তার ওপর আঘাতের পাশাপাশি তার মানসিক, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনকেও বিপর্যস্ত করে দেয়। কিন্তু যখন অপরাধীরা দেখে যে তাদের অপরাধের দ্রুত ও নিশ্চিত বিচার হচ্ছে না, তখন তাদের মধ্যে ভয় বা অনুশোচনা জন্মায় না। বরং একটি নীরব বার্তা ছড়িয়ে পড়ে- ক্ষমতা, প্রভাব বা টাকার জোরে পার পাওয়া সম্ভব। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশ সদর দপ্তরের বরাত দিয়ে বলা হয়, গত এক বছরে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। গত বছর নারী নির্যাতনের যত মামলা হয়েছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ধর্ষণের অভিযোগের। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে মামলা হয়েছে ২১ হাজার ৯৩৯টি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ৯টি অভিযোগে মামলা করা যায়। সেগুলো হলো ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারণে মৃত্যু, বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, যৌন পীড়ন, যৌতুক, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশে শিশুর অঙ্গহানি, দহনকারী পদার্থ দিয়ে সংঘটিত অপরাধ। ২০২৫ সালে হওয়া মামলার মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা ধর্ষণের অভিযোগের। ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৫ হাজার ১৭১ জন ও শিশু ১ হাজার ৮৯৭ জন। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর নারী নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি মামলা হয়।

এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি। তার আগে ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১টি, ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬টি ও ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬টি মামলা হয়েছিল নারী নির্যাতনের অভিযোগে। উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি। ঢাকার ৯টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১১ হাজার ৫৬৭টি। ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ৩ হাজার ৯১টি মামলা। বিচারিক কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রিতা কিংবা বিচারহীনতার বিষয়টি কয়েকটি ধাপে কাজ করে। প্রথমত, অভিযোগ গ্রহণে গড়িমসি।

অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে মামলা করতে চান না বা পারেন না। সামাজিক লজ্জা, পরিবারের চাপ, পুলিশের অসহযোগিতা- সব মিলিয়ে প্রথম ধাপেই বাধা তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, তদন্ত প্রক্রিয়ার দুর্বলতা। যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহ, ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষ্যগ্রহণ—এসব ক্ষেত্রে অবহেলা বা অদক্ষতা দেখা যায়। ফলে আদালতে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, দীর্ঘসূত্রতা। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, সাক্ষীরা নিরুৎসাহিত হন, ভুক্তভোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। শেষ পর্যন্ত অনেক সময় আপস বা প্রত্যাহারের পথই বেছে নেওয়া হয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ১১ হাজারের বেশি মামলা তদন্ত করে ধর্ষণের ৪৪ শতাংশ অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ার কথা বলা হয়। প্রমাণিত না হওয়া মামলার অন্তত ৩০ শতাংশ সত্য। সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে, বাদীর অনীহা আর তদন্ত কর্মকর্তার অদক্ষতায় তদন্তে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি বলে কর্মকর্তারা জানান। দীর্ঘসূত্রিতার কারণে এসব মামলায় পুলিশ ও চিকিৎসকের মতো পেশাদার সাক্ষীরা অনেক সময় আসেন না। অনেকে বদলি হয়ে যান। তাঁদের আসা-যাওয়ার কোনো খরচও দেওয়া হয় না। ফলে মামলা সাক্ষীর অভাবে দূর্বল হয়ে যায়।

মো. তাহমিদ রহমান

শিক্ষক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত