স্বপ্ন কখনও থেমে থাকে না

মো. নাজমুল হাসান

প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের জীবনে এমন কিছু গল্প থাকে, যা শুধু একটি ব্যক্তির সাফল্যের কাহিনী নয়, বরং একটি সমাজকে জাগিয়ে তোলার শক্তি রাখে। সিভাসুর (চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়) মেধাবী ছাত্রী সাবিকুন নাহার উর্মির জীবনের গল্প তেমনই এক অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা। তার অদম্য পরিশ্রম, অটল মনোবল এবং স্বপ্নের প্রতি অবিচল বিশ্বাস প্রমাণ করে- পরিশ্রম কখনই বৃথা যায় না, যদি সেই পরিশ্রমের সঙ্গে থাকে ধৈর্য, সাহস এবং দৃঢ় সংকল্প।

জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও চ্যালেঞ্জিং সময়গুলোর একটি হলো মাতৃত্বকাল। এই সময় একজন নারীর শরীর যেমন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তেমনি মানসিক দিক থেকেও তাকে নানা ধরনের চাপ ও দুশ্চিন্তার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু এই কঠিন সময়েই সাবিকুন নাহার উর্মি তার জীবনের অন্যতম বড় লক্ষ্য- ৪৬তম বিসিএস অর্জনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন। বাচ্চা কনসিভ করার পর থেকেই তিনি প্রিলিমিনারি পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা শুরু করেন। শারীরিক অসুস্থতা, ক্লান্তি এবং নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনই নিজের স্বপ্ন পিছিয়ে দেননি।

তার এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিদিনের ক্লান্তি, অসুস্থতা, পারিবারিক দায়িত্ব- সবকিছুর মধ্যেও তিনি সময় বের করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। অনেক সময় হয়তো অন্য কেউ হলে থেমে যেত, কিন্তু উর্মি থামেননি। কারণ তিনি জানতেন, আজকের এই কষ্টই একদিন তার সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দেবে। তার এই আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রমের ফলেই তিনি ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন।

কিন্তু প্রিলিমিনারি পাস করাই ছিল না তার চূড়ান্ত লক্ষ্য; বরং এটি ছিল আরও বড় একটি যাত্রার শুরু। এরপর শুরু হয় রিটেন পরীক্ষার প্রস্তুতি- যা বিসিএসের সবচেয়ে কঠিন ধাপগুলোর একটি। এই সময়টাতে তার জীবনে যুক্ত হয় নতুন একটি দায়িত্ব-মাতৃত্ব। ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে, তার যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। রাতের পর রাত জেগে থাকা, শিশুর দেখাশোনা করা এবং ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনা- এই কঠিন রুটিনই হয়ে ওঠে তার প্রতিদিনের সঙ্গী। একজন মা হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং একজন স্বপ্নপূরণের যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে এগিয়ে নেওয়া- এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সত্যিই বিরল এক উদাহরণ। অনেক সময় হয়তো তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, অনেক সময় হয়তো মনে হয়েছে সবকিছু ছেড়ে দেন; কিন্তু তার ভেতরের অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে বারবার দাঁড় করিয়েছে, সামনে এগিয়ে যেতে প্রেরণা জুগিয়েছে।

আসলে এই যুদ্ধটা সহজ ছিল না, যুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতি শুরু হয় রিটেন পরীক্ষার সময়। পরীক্ষার হলে বসে যখন অন্যরা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে মাথা নিচু করে লিখে চলে, তখন একজন মা একসঙ্গে দুইটা যুদ্ধ লড়ে- একদিকে প্রশ্নপত্র, অন্যদিকে বুকের ভেতর জমে থাকা দুশ্চিন্তা- ‘বাচ্চাটা ঠিক আছে তো?’ বাচ্চার কান্না, খাওয়ানোর সময়, পরীক্ষার আগের দিন ঠিকমত ঘুম না হওয়া- সবকিছু মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে। কলম হাতে থাকলেও মনটা পড়ে থাকে বাচ্চার কাছেই।

অনেক সময় পরীক্ষার আগের রাতটাই কাটে নির্ঘুমণ্ডবাচ্চার জ্বর, কান্না কিংবা খাওয়ানোর জন্য বারবার উঠে বসা। ফলে পরীক্ষার হলে বসে শরীর থাকে ক্লান্ত, চোখে ঘুম, কিন্তু হাল ছাড়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি শব্দ লেখা হয় নিজের স্বপ্নের জন্য, আর প্রতিটি মুহূর্ত সহ্য করা হয় সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য।

এই কষ্টটা আসলে ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না। এটা সেই ত্যাগ, যেখানে একজন মা নিজের স্বপ্ন আর সন্তানের যত্ন- দুটোই একসঙ্গে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। কলমের কালি আর মায়ের চোখের ক্লান্তি- দুটো মিলেই তৈরি হয় এক অসাধারণ সংগ্রামের গল্প। এমন মায়েদের জন্য বিসিএস শুধু একটা পরীক্ষা না, এটা তাদের ধৈর্য, ভালোবাসা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন আসে। তার কঠোর পরিশ্রম, আত্মনিবেদন এবং অবিচল মনোবল তাকে ৪৬তম বিসিএসের রিটেন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে। এরপর আসে ভাইভা- শেষ ধাপ। আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে তিনি এই ধাপটিও সফলভাবে অতিক্রম করেন। সব বাধা-বিপত্তি জয় করে তিনি অর্জন করেন মৎস্য ক্যাডারের গৌরবময় পদ। মৎস্য ক্যাডারে তিনি হন চতুর্থ।

এই সাফল্য শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি আমাদের সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য এক শক্তিশালী বার্তা। বিশেষ করে নারীদের জন্য এটি এক উজ্জ্বল উদাহরণ যে, জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিতেই স্বপ্ন দেখা যায়, এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাও সম্ভব। সমাজে এখনও অনেক ধারণা আছে যে, মাতৃত্ব বা পারিবারিক দায়িত্ব নারীর অগ্রগতির পথে বাধা হতে পারে। কিন্তু সাবিকুন নাহার উর্মির গল্প সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, ইচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে কোনো বাধাই অতিক্রম করা অসম্ভব নয়।

তার এই সংগ্রামী জীবনের গল্প আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- সাফল্য কখনই হঠাৎ করে আসে না। এর পেছনে থাকে অসংখ্য নির্ঘুম রাত, অগণিত ত্যাগ এবং অদম্য পরিশ্রম। অনেক সময় আমরা ব্যর্থ হয়ে হতাশ হয়ে পড়ি, পথ থেকে সরে যাই। কিন্তু উর্মির মতো মানুষরা আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, ব্যর্থতা সাময়িক, কিন্তু চেষ্টা চালিয়ে গেলে সাফল্য একদিন অবশ্যই আসবে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত তার এই অনন্য উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়া। জীবনে যত বাধাই আসুক, আমরা যেন আমাদের লক্ষ্যে অবিচল থাকি, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখি এবং নিরলস পরিশ্রম চালিয়ে যাই। কারণ, প্রতিটি স্বপ্নের পেছনে যদি থাকে আন্তরিক প্রচেষ্টা, তবে সেই স্বপ্ন একদিন না একদিন বাস্তবে রূপ নেবেই। সর্বোপরি, সাবিকুন নাহার উর্মির এই অনুপ্রেরণামূলক গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি চিরন্তন সত্য- ‘মানুষের পরিশ্রম কখনই বৃথা যায় না; সঠিক সময়ে তা সফলতার আলো হয়ে ফিরে আসে।’

মো. নাজমুল হাসান

সাবেক শিক্ষার্থী, পশুপালন অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়