প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৯ মার্চ, ২০২৬
দীর্ঘ ছুটির নীরবতা ভেঙে আবারও মুখরিত হতে যাচ্ছে প্রিয় প্রাঙ্গণ। পবিত্র মাহে রমজান ও ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি শেষে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠছে। কিন্তু এই আনন্দ উছ¡াসের আড়ালে রয়ে গেছে এক গভীর দুশ্চিন্তা- ‘’শিখন ঘাটতি’। করোনা মহামারি থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সামাজিক নানা সীমাবদ্ধতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা যে পিছিয়ে পড়েছে, তা কাটিয়ে ওঠাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। এখন সময় এসেছে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেই খতিয়ে যাওয়া পাঠ পূরণ করার। নিচে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়, ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি- / নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ এই অঙ্গীকার রক্ষার্থেই আমাদের এখন পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি তৈরির অসংখ্য কারণের মধ্যে কয়েকটি কারণ এখানে উল্লেখ করা হলো- ২০২০ সাল থেকে শুরু হওয়া বৈশ্বিক মহামারি শিক্ষাব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘকাল স্কুল বন্ধ থাকায় পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যে বিচ্ছেদ ঘটেছে, তা শিখন ঘাটতির প্রধানতম কারিগর। রমজান, ঈদ ও গ্রীষ্মকালীন দীর্ঘ ছুটির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক বা শিক্ষক আন্দোলনের কারণে নির্ধারিত ক্লাস সংখ্যা কমে গেছে। ফলে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে সিলেবাস শেষ করতেও ব্যর্থ হয়েছে বলে কয়েকজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান আমাকে বলেন। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সিলেবাস শেষ হলেও গভীরে গিয়ে শেখার সুযোগ মেলেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও তীব্র তাপদাহের কারণে বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে প্রায়ই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়, যা নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষাদানে বাধার সৃষ্টি করে।
শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট সব জায়গায় সমান না হওয়ায় পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হয়েছে। অনলাইন ক্লাসের জন্য স্মার্টফোন হাতে পেলেও অনেক শিক্ষার্থী গঠনমূলক ব্যবহারের চেয়ে গেম আসক্তি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশি সময় ব্যয় করেছে, যা মনোযোগের বিচ্যুতি ঘটিয়েছে। দরিদ্র পরিবারের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী একটি স্মার্টফোনের অভাবে অনলাইন পাঠদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যা তাদের সহপাঠীদের তুলনায় পিছিয়ে দিয়েছে। অতিমারি বা মুদ্রাস্ফীতির কারণে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে। পরিবারের অস্থিরতা ও অভাব অনটন শিক্ষার্থীর পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করেছে। নতুন শিক্ষাক্রমের সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের খাপ খাইয়ে নিতে সময় লাগছে। এই পরিবর্তনের মধ্যবর্তী সময়ে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে শিখন প্রক্রিয়ায় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সব বিষয়ের মানসম্মত বই হাতে না পাওয়া শিখন যাত্রাকে শুরুতেই মন্থর করে দিয়েছে। বিশেষ করে অন্তবর্তী কালীন সরকারের সময়ের ২০২৫-২৬ সালের জানুয়ারি মাসে নতুন পাঠ্যপুস্তক হতে কোমলমতি শিক্ষার্থীগণ বঞ্চিত হয়েছে। আধুনিক ও সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংকট শিখন ঘাটতিকে আরও ঘনীভূত করেছে। দীর্ঘ সময় ঘরের কোণে বন্দি থাকা এবং সামাজিক মেলামেশার অভাব শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, যা তাদের শিখনের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। পরীক্ষা বা মূল্যায়নের ধরণ বারবার পরিবর্তন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও দায়সারা ভাব তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞান বা কারিগরি বিষয়ে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ না পাওয়ায় তাত্ত্বিক জ্ঞান শুধু মুখস্থবিদ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। অনেক অভিভাবক সন্তানের পড়াশোনার চেয়ে ঘরোয়া কাজে বা উদাসীনতায় সময় পার করেছেন, যা শিক্ষার্থীর নিয়মিত পড়াশোনার শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছে।
পরিবারের অভাব মেটাতে অনেক শিক্ষার্থী স্কুল ছেড়ে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়েছে। এই দীর্ঘ বিরতি তাদের পুনরায় মূল ধারায় ফিরতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে স্কুল বন্ধ থাকাকালীন নারী শিক্ষার্থীদের বাল্যবিবাহের হার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি বড় অংশের শিখন প্রক্রিয়া চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে। পুষ্টিকর খাবারের অভাব ও শারীরিক অসুস্থতা শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে ও দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে বাধা দিচ্ছে।
শিখন ঘাটতি পূরণে সরকারের স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য আমি বাংলাদেশ সরকারকে নিম্নলিখিত প্রস্তাবনা পেশ করছি-
স্বল্প সময়ে সিলেবাসের মূল অংশগুলো পড়ানোর জন্য ‘এক্সিলারেটেড লার্নিং প্রোগ্রাম’ গ্রহণ করে অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, যাতে দ্রুত ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা যায়। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে নিয়মিত ক্লাসের বাইরে অতিরিক্ত বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেখানে তাদের দুর্বল জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করা হবে। সংসদ টিভি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মানসম্মত রেকর্ড করা ক্লাস প্রচার বাড়ানো যেতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীরা যেকোনো সময় তাদের পাঠ ঝালাই করে নিতে পারে। শিক্ষকদের জন্য দ্রুততম সময়ে নতুন কারিকুলাম ও শিখন ঘাটতি শনাক্তকরণের ওপর বিশেষ ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম গ্রহণ করে, উহা আগামী এক মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফেরাতে ‘মিড-ডে মিল’ ও উপবৃত্তির কার্যক্রম আরো জোরদার করা যেতে পারে। যাতে আর্থিক কারণে কেউ শিক্ষা থেকে দূরে না থাকে। অতীব জরুরী ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিখন অগ্রগতি সরাসরি মনিটরিং করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। সারা দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে, উহা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। সরাসরি পাঠদানের পাশাপাশি অনলাইন মাধ্যমকে স্থায়ীভাবে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ করে তোলা যেতে পারে, যাতে যেকোনো দুর্যোগে শিক্ষা কার্যক্রম থেমে না যায়। বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক নতুন শিক্ষাক্রমের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা উচিত, যা দীর্ঘ মেয়াদে ঘাটতি রোধ করবে। আপসহীনভাবে মেধার ভিত্তিতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং তাদের পেশাগত মান উন্নয়নের জন্য নিয়মিত আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
প্রতিটি বিদ্যালয়ে অন্তত একজন করে কাউন্সিলর বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদী সেবা নিশ্চিত করার যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করে, উহা একটা নির্দিষ্ট ডেড লাইনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
প্রতিটি শিক্ষার্থীর শিখনের স্তর ট্র্যাক করার জন্য জরুরী ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা উচিত, যাতে করে তাদের ব্যক্তিগত শিখন ঘাটতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যেখানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হয় জিডিপি ক্ষুদ্র অংশ। এ কারণে জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষায় বরাদ্দ রাখা উচিত, যাতে অবকাঠামো ও গবেষণার মাধ্যমে একটি টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। শিক্ষক হলেন আলোকবর্তিকা। তাকে শুধু সিলেবাস শেষ নয়, বরং শিক্ষার্থীর বন্ধু হয়ে বুঝতে হবে কার কোথায় সমস্যা। মমতার সঙ্গে পাঠদানই পারে শিক্ষার্থীর ভয় দূর করতে। সন্তানদের বাসায় পড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া এবং স্মার্টফোনের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা অভিভাবকদের প্রধান দায়িত্ব। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কমিটিকে সজাগ থাকতে হবে। তারা শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবেন। নিজের ঘাটতি বুঝতে পেরে শিক্ষকদের সাহায্য নেওয়া এবং নিয়মিত অধ্যবসায় করা শিক্ষার্থীদের প্রধান কাজ। মনে রাখতে হবে, প্রচেষ্টাই সফলতার চাবিকাঠি। ঝরেপড়া রোধে সমাজের সচেতন মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। সরকারি নির্দেশনার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও বিত্তবানদের শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সহায়তার মাধ্যমে একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসতে। শিখন ঘাটতি মেটানো কোনো একক পক্ষের কাজ নয়। এটি একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। সরকার পরিকল্পনা দিলেও এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের আন্তরিক প্রচেষ্টার ওপর। আমরা যদি আজ এই ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হই, তবে ভবিষ্যতে একটি দক্ষ জনশক্তির অভাব দেখা দেবে।
পরিশেষে বলতে চাই, শিখন ঘাটতি শুধু একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়- ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।’ আমাদের সেই ভয়শূন্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে প্রতিটি শিশু তার হারানো মেধা বিকাশের সুযোগ পাবে। তাই আসুন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার এই নতুন সূচনায় আমরা সবাই মিলে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াই এবং তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করি। সরকার, শিক্ষক ও অভিভাবক যদি একযোগে কাজ করেন, তবে এই ঘাটতি পূরণ করে আমরা একটি সমৃদ্ধ ও শিক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল